বিহার ভোটের লড়াইয়ে বিরোধীদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বানার্জি কমিশনের রিপোর্ট। কিন্তু কে এই বাঙালি, যাঁর রিপোর্টে তোলপাড় রাজনীতি? জেনে নিন বিস্তারিত।
.jpeg.webp)
দেবব্রত বন্দোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 15 October 2025 22:12
বিহারে বিধানসভা (Bihar Assembly election 2025) নির্বাচনের প্রথম দফার জন্য প্রার্থী ঘোষণা শুরু করে দিয়েছে দলগুলি। পাশাপাশি নির্বাচনী ইস্তাহার (election manifesto) তৈরি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। যদিও বিক্ষিপ্তভাবে শাসক ও বিরোধী দুই পক্ষই কিছু আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে। যেমন এনডিএ (NDA) জানিয়েছে তারা মহিলাদের এককালীন ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেবে যাতে তারা ছোট কোন ব্যবসা বা কারবার চালু করতে পারেন। অন্যদিকে বিরোধী জোটের মুখ তেজস্বী যাদব (tejaswi Yadav) ঘোষণা করেছেন, তারা সরকার গড়তে পারলে বিহারের সব পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি (government job for every family) দেবেন। বিক্ষিপ্তভাবে আরও বেশকিছু প্রতিশ্রুতির কথা দুই শিবির থেকেই সোনা গিয়েছে।
তবে লালু প্রসাদ যাদবের (Lalu Prasad Yadav) রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (Rashtriy Janata Dal) নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট তথা মহাগঠবন্ধন ভূমি সংস্কার তথা জমিয়ে নিয়ে অভিনব প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করতে চলেছে বলে একাধিক সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে। তার মধ্যে অন্যতম হল দেবব্রত বন্দোপাধ্যায় কমিশনের (Debabrata Bandopadhyay commission report on Bihar land reforms) সুপারিশ বাস্তবায়ন। তাতে বিহারে পশ্চিমবঙ্গের মতো আমূল ভূমি সংস্কারের কথা বলা আছে। যাতে ভূমিহীন মানুষের হাতে সরকার জমি তুলে দিতে পারে।
জানা যাচ্ছে বাম দলগুলি এই ব্যাপারে আরজেডি এবং কংগ্রেসের সঙ্গে কথা বলেছেন। সিপিএম সিপিআই এবং সিপিআইএমের লিবারেশন-(CPM CPI and CPI ML) বিহারের বিরোধী জোটে থাকা এই তিন বা বাম দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর কথা হয়েছে। অন্যদিকে পাটনায় লালু প্রসাদ যাদব এবং তাঁর পুত্র তেজস্বী সঙ্গে কথা হয় বাম নেতাদের। সব পক্ষই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে মহাগঠবন্ধনের ইস্তাহারে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন।
ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিহারে প্রত্যেক ভূমিহীন দরিদ্র পরিবারকে (landless family) অন্তত দশ কাঠা করে জমি বিনামূল্যে সরকারের তরফে দিতে হবে। এইভাবে প্রায় ছয় লক্ষ ভূমিহীন ক্ষেত মজুরকে জমি দেওয়া সম্ভব বলে কমিশন রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বাম জমানার শেষ দিকে এই ধরনের একটি প্রকল্প 'আমার জমি আমার ঘর' বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পের নাম বদল করলেও সেটি চালু আছে। বিভিন্ন ব্লকে সরকারের হাতে থাকা ল্যান্ড ব্যাংকে জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিলি বন্টনের কাজ এখনও চলমান। বিহারে সেই একই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিতে চলেছে বিরোধী জোট।
দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, বর্গাদার (sharecropper) অর্থাৎ অন্যের জমিতে চাষ করেন যে কৃষকেরা তাদের নাম সরকারি নথিপত্রে নথিভূক্ত করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট জমানার শুরুতেই অপারেশন বর্গা কর্মসূচি (operation barga program of West Bengal) বাস্তবায়ন করা হয়। কর্মসূচির মূল বিষয় ছিল বর্গাদারদের নাম সরকারি খাতায় নথিভুক্ত করা। যাতে জমির মালিক তাদেরকে ইচ্ছেমতো উৎখাত করতে না পারে। বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশন বিহারের রিপোর্টে আরও বলেছে, রাজ্যের বহু কৃষকের হাতে বিপুল পরিমাণ জমির রয়েছে। ওই জমির উর্ধ্বসীমা বেঁধে দিয়ে উদ্বৃত্ত অংশ সরকার নিজের হাতে নিয়ে ভূমিহীনদের মধ্যে বিলি করতে পারে।
কে এই দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় যার ১৭ বছর আগে দেওয়া না রিপোর্ট ২০২৫ এ বিহার বিধানসভা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চলেছে? ৯৪ বছর বয়সি এই প্রবীণ এক কথায় ভারতে ভূমি সংস্কার বিষয়ে একজন পথিকৃৎ। রাজনীতির বৃত্তের বাইরে তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি এই বিষয়ে দীর্ঘদিন আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভূমি সংস্কার কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিল। সেই সময় এর রাজ্যের ভূমি কমিশনার ছিলেন আইএস অফিসার দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে আর পাঁচ জন আম্লার মত তিনি অফিসের ঠান্ডা ঘরে বসে দায়িত্ব পালন করতেন না। কাদামাটি মাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে দিনের পর দিন ঘুরেছেন এবং কৃষকদের সমস্যা উপলব্ধি করার পর সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন কী করনীয়। অপারেশন বর্গাসহ বামফ্রন্ট সরকারের ভূমি সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম বাস্তবায়ক ছিলেন এই আমলা। যদিও একপর্যায়ে শীর্ষ বাম নেতাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তিনি ওই দায়িত্ব থেকে সরে যান।
পরবর্তীকালে তিনি ম্যানিলায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর ভারতের যোজনা কমিশনের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করার সময় ভূমি সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জমিহারা মানুষের পুনর্বাসন নিয়েও দীর্ঘদিন কাজ করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর প্রবীন এই প্রাক্তন আমলা ও ভূমি বিশেষজ্ঞকে রাজ্যসভার সদস্য করেন। তখনও জমি নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলিকে পরামর্শ দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এই আইএএস অফিসার।
১৭ বছর আগে পেশ করা ভূমি সংস্কার সংক্রান্ত রিপোর্ট তাঁর রিপোর্টকে কেন হাতিয়ার করতে চলেছে বিহারের বিরোধী শিবির? জানা যাচ্ছে এর প্রধান কারণ মুখ্য তো দুটি। প্রথমত দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে মাথায় রেখে বিহারে ভূমি সংস্কার কার্যক্রম চালু করার জন্য কমিশন গঠন করেছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ কুমার। সেটা ২০০৬ সালের সিদ্ধান্ত। তার আগের বছর নীতীশ বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন।
কিন্তু আশ্চর্যের হল দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে পরবর্তীকালে নীতীশ কুমার আর তেমন অগ্রসর হননি। বিষয়টিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জড়িয়ে দেন বলে বিরোধীদের অভিযোগ। বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের সুপারিশ গুলি কার্যকর করার সম্ভব কিনা তা খতিয়ে দেখতে তিনি বিহারের একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলা কে মাথায় রেখে কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির রিপোর্টের পক্ষে সায় দিলেও নীতিশ আর এ নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস এবং বাম দলগুলি মনে করছে, বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একদিকে যেমন ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হবে একইভাবে নীতীশ কুমারকে গরিব বিরোধী হিসেবে তুলে ধরাও সহজ হয়ে যাবে।
বিরোধীদের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিহারে ভূমি সংস্কার নিয়ে সারা ফেলে দেওয়া। নীতীশ সরকারের তৈরি আর একটি রিপোর্টকেই এই ব্যাপারে হাতিয়ার করতে চলেছে তারা। ২০২৩-এ নীতীশ কুমার কুমার ফের বিজেপির হাত ধরার আগে তা সরকারের শরিক ছিল আরজেডি। তেজস্বী যাদব ছিলেন উপমুখ্যমন্ত্রী। নীতীশ ও তেজস্বী যৌথভাবে ঘোষণা করেন বিহারে জাত শুমারি করা হবে। তার আগে দুজনে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করে গোটা দেশেই এই শুমারি করার দাবি জানিয়ে আসেন। ফলে নীতীশ কুমার যে জাত শুমারি করিয়েছেন তার কৃতিত্ব দাবি করেন তেজস্বীও।
জাত শুমারিতে জানা গিয়েছে বিহারে ৬৫ শতাংশ পরিবার অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণি বা ওবিসি ভুক্ত। তাদের সিংহভাগ আবার যাদব সম্প্রদায়ের মানুষ। বিহারে যাদবদের সিংহভাগ রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সমর্থক। এছাড়া আর মহাগঠবন্ধনের পাশে আছে মুসলিমরাও। তাদেরও সিংহভাগ ভূমিহীন। বিরোধী শিবির মনে করছে, বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টকে হাতিয়ার করে বিজেপি-জেডিইউ'র নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন এনডিএ'কে জব্বর জবাব দেওয়া যাবে।
পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ ক্ষমতায় আসা বামফ্রন্টের দীর্ঘ ইনিংসের পেছনে ভূমি সংস্কার কর্মসূচির সাফল্য অনস্বীকার্য। ওই কর্মসূচি সুবাদে গ্রামবাংলায় সিপিএম সহ বাম দলগুলির স্থায়ী ভোটব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এই সাফল্যের পেছনে তৎকালীন ভূমি কমিশনার দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিছক কম নয়
আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমি আন্দোলনেও লেখালেখি এবং সভা সমিতি করে জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন দেবব্রত বন্দোপাধ্যায়। যদিও বাম নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনই বিচ্ছিন্ন হয়নি। সিপিএমের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সিতারাম ইয়েচুরি রাজ্যসভার সদস্য থাকাকালে অধিবেশনে ভূমি সংস্কারে দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকার প্রশংসা করেন। রাজ্যসভার কার্যবিবরণীতে যা নথিভুক্ত হয়ে আছে।
বিহারে বিরোধী জোট দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমি সংস্কার কমিশনের রিপোর্টকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারলে এই বাঙালি আইএস অফিসারের সাফল্যের মুকুটে আরো একটি পালক যুক্ত হবে সন্দেহ নেই। বাম ও অবাম দুই শিবিরের কাছেই তিনি সমান সমাদৃত। বিহারেও তিন বাম দল সিপিএম সিপিআই এবং সিপিআইএমের লিবারেশন দীর্ঘদিন ধরে নীতির সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে যাচ্ছিল বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে হবে। পরে তাতে গলা মেলায় রাষ্ট্রীয় জনতা দল এবং কংগ্রেস।