
সঞ্জয় গান্ধীর নির্দেশ ও ইতিহাসের কালো অধ্যায়। ছবি এআই দিয়ে তৈরি করা।
শেষ আপডেট: 7 January 2026 14:18
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুরনো দিল্লির তুর্কমান গেটে (Turkman Gate Violence) একটি মসজিদের কাছে আদালতের নির্দেশে চালানো উচ্ছেদ অভিযানে (Delhi Demolition) হিংসার ঘটনায় বুধবার পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশ (Delhi Police)। তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন সমাজবাদী পার্টির (Samajwadi Party) সাংসদ মহিবুল্লাহ নাদভি, যিনি জনতাকে উসকানি দিয়েছেন বলে পুলিশের অভিযোগ।
পাথর ও বোতল ছোড়া, আহত পাঁচ পুলিশ
দিল্লি পুরসভা (MCD) যখন সৈয়দ ফয়েজ ইলাহী মসজিদ ও সংলগ্ন কবরস্তানের পাশের জমিতে উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছিল, তখন পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও কাচের বোতল ছোড়া হয়। ঘটনায় অন্তত পাঁচজন পুলিশকর্মী আহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, পাথর ছোড়ার ঘটনায় অভিযুক্তদের নাম, আদিল কাসিম, মহম্মদ কাইফ, মহম্মদ আরিব, উজাইফ, আজিম ও ইরফান। এছাড়াও আদনান ও সামির নামে দুই ব্যক্তি হিংসা উসকে দিতে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও ও অডিও বার্তা ছড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ (WhatsApp Provocation)। মঙ্গল ও বুধের মধ্যবর্তী রাত ১টা নাগাদ অভিযান শুরু হয়। দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে প্রায় ১০০ বছরের পুরনো বহু অবৈধ নির্মাণ ভাঙা হয় (Delhi High Court Order)।
সঞ্জয় গান্ধীর নির্দেশ ও ইতিহাসের কালো অধ্যায়
আমি চাই, তুর্কমান গেট থেকে জামা মসজিদ স্পষ্ট দেখা যাক— ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসে একদিন তুর্কমান গেট পরিদর্শনে এসে একথাই বলেছিলেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছোট ছেলে সঞ্জয় গান্ধী ((Sanjay Gandhi, Emergency Era)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন ডিডিএ ভাইস চেয়ারম্যান জগমোহন মালহোত্রা। সেই কথাকেই ‘আদেশ’ হিসেবে ধরে নিয়ে তুর্কমান গেট থেকে জামা মসজিদের মাঝখানে থাকা সমস্ত বস্তি ও নির্মাণ ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । ১৩ এপ্রিল, ১৯৭৬-এ একটি পুরনো বুলডোজার পৌঁছে যায় তুর্কমান গেটে। বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রথমে মানুষকে শান্ত রাখতে ফুটপাত ভাঙা শুরু করা হয়। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, ঘরবাড়ি ভাঙা হবে না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুলডোজার গড়িয়ে পড়ে ঝুপড়ি ও বাড়ির উপর। কান্না আর হাহাকারের মধ্যে মানুষ চোখের সামনে ভেঙে যেতে দেখে তাদের আশ্রয় (Bulldozer Action)।
জরুরি অবস্থার রক্তাক্ত অধ্যায়
ঘটনাটি ছিল জরুরি অবস্থার সময়। যখন গণতন্ত্র কার্যত কারাবন্দি, বিরোধী নেতারা জেলে, প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তুর্কমান গেট উচ্ছেদ সেই সময়ের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায় (Emergency 1975-77)। ১৯৭৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রায় ৫০০ মহিলা তাঁদের সন্তানদের নিয়ে উচ্ছেদস্থলে জড়ো হন। হাতে কালো ফিতে বেঁধে তাঁরা বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি সামলাতে সিআরপিএফ নামানো হয়। উত্তেজিত জনতা ধ্বংসস্তূপ থেকে পাথর ছুড়তে শুরু করে। পুলিশ গুলি চালায়। সরকারি নথিতে ছ’জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও, প্রবীণ সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার তাঁর বই ‘The Judgement’-এ লেখেন, পুলিশের গুলিতে প্রায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছিল (Turkman Gate Firing)।
আইন উপেক্ষা করে উচ্ছেদ
শাহ কমিশনের রিপোর্টে উঠে আসে, জরুরি অবস্থায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় আইন না মেনে উচ্ছেদ চালানো হয়েছিল। দিল্লিতেই ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭-এর মধ্যে ১ লক্ষ ৫০ হাজারের বেশি নির্মাণ ভেঙে ফেলা হয়, বাস্তুচ্যুত হন প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ (Shah Commission)।
ফের তুর্কমান গেট, আবার বুলডোজার
৬–৭ জানুয়ারি গভীর রাতে ফয়েজ-এ-ইলাহী মসজিদের কাছে ৩০টিরও বেশি বুলডোজার নিয়ে অভিযান শুরু হলে পুরনো ক্ষত ফের মনে পড়ে গিয়েছে স্থানীয়দের। শীতের রাত অগ্রাহ্য করেও প্রবল বাধার মুখে পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সংঘর্ষে একাধিক ব্যক্তি আহত হন।