কেন্দ্র আদালতকে আরও জানায়, সাম্প্রতিক ওয়াকফ আইন সংশোধনের মাধ্যমে এমন বহু সমস্যার সমাধান করা হয়েছে, যা ১৯২৩ সাল থেকে ব্রিটিশ এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় সরকারগুলোও মেটাতে পারেনি।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 21 May 2025 16:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'ওয়াকফ ইসলাম ধর্মে দানের একটি রূপ মাত্র। এটি ইসলাম ধর্মের অপরিহার্য অংশ নয়।' ২১ মে, বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এক গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে জানিয়ে দিল কেন্দ্র। সরকারের পক্ষ থেকে সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে বলেন, 'ওয়াকফ একটি ইসলামী ধারণা ঠিকই, কিন্তু এটি ইসলাম ধর্মের মৌলিক বা অপরিহার্য অনুষঙ্গ নয়। এটি কেবল দানের একটি মাধ্যম। যা প্রতিটি ধর্মেই রয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মেও দান আছে, হিন্দু ধর্মে ‘দান’-এর রীতি রয়েছে, শিখ ধর্মেও একইরকম ব্যবস্থা দেখা যায়।'
তিনি আরও বলেন, ওয়াকফ বোর্ড কেবলমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ কাজ পরিচালনা করে থাকে। এই প্রসঙ্গে ওঠে মন্দির পরিচালনার বিষয়। 'মন্দির পরিচালনা একান্তই ধর্মীয় কাজ, যা ওয়াকফের মতো নয়। মন্দিরের প্রশাসনের দায়িত্ব এমনকি একজন মুসলমানের হাতেও থাকতে পারে।' শেষে জুড়ে দেন আইনজীবী।
এই যুক্তিগুলি উপস্থাপন করা হয় মুসলিম পক্ষের বক্তব্যের একদিন পরেই। কেন্দ্রের পক্ষে আদালতে উপস্থিত থেকে তুষার মেহতা জানান, বিতর্কিত ‘waqf-by-user’ নীতির আওতায় যেসব সম্পত্তি ওয়াকফ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলি পুনরুদ্ধার করার আইনগত অধিকার সরকারের রয়েছে। বলেন, 'সরকারি জমির উপর কারও ব্যক্তিগত অধিকার নেই। সুপ্রিম কোর্টের রায়ও বলছে, যদি কোনও সম্পত্তি সরকারের হয় এবং তা ওয়াকফ হিসেবে ঘোষিত হয়ে থাকে, তাহলেও সরকার সেই সম্পত্তি রক্ষা করতে পারে।'
প্রসঙ্গত, পুরনো আইনে থাকা ‘ওয়াকফ-বাই-ইউজার’ ধারা অনুযায়ী, কোনও সম্পত্তি দীর্ঘ সময় ধরে ধর্মীয় বা দাতব্য কাজে ব্যবহৃত হলে, প্রমাণপত্র ছাড়াও তা ওয়াকফ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারত। তবে নতুন আইনে এই ধারা তুলে দেওয়া হয়েছে। এই মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে ওয়াকফ আইনকে, যার আওতায় সরকার ওয়াকফ সম্পত্তির উপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে।
সলিসিটার জেনারেল এদিন আদালতে উল্লেখ করেন, ‘ওয়াকফ-বাই-ইউজার’ কোনও মৌলিক অধিকার নয়। এই ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতে তিনটি শর্ত সাপেক্ষে নিষিদ্ধ করা হয়েছে— সম্পত্তিটি ওয়াকফ রেজিস্ট্রিতে নথিভুক্ত থাকতে হবে, তা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে হবে এবং সরকারি জমি হলে নির্দিষ্ট ছাড়প্রাপ্ত হতে হবে।
কেন্দ্র আদালতকে আরও জানায়, সাম্প্রতিক ওয়াকফ আইন সংশোধনের মাধ্যমে এমন বহু সমস্যার সমাধান করা হয়েছে, যা ১৯২৩ সাল থেকে ব্রিটিশ এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় সরকারগুলোও মেটাতে পারেনি। মেহতা বলেন, 'আমরা সেই দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো দূর করছি। প্রতিটি অংশীদারের কথা শোনা হয়েছে। কয়েকজন আবেদনকারী গোটা মুসলিম সমাজের প্রতিনিধি হতে পারে না। আমরা ৯৬ লক্ষ প্রতিনিধির বক্তব্য পেয়েছি। সংসদের যৌথ সংসদীয় কমিটি (JPC)-র ৩৬টি বৈঠক হয়েছে এই বিষয়ে।'
এর আগের দিন, মঙ্গলবার, প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই-এর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে সিনিয়র অ্যাডভোকেট কপিল সিব্বল আবেদনকারীদের পক্ষে যুক্তি পেশ করা শুরু করলে আদালত জানায়, সংসদে পাস হওয়া আইনের ক্ষেত্রে 'প্রিসাম্পশন অফ কনস্টিটিউশনালিটি' থাকে। অর্থাৎ সেটিকে সাংবিধানিক বলেই ধরা হয়, যতক্ষণ না সুস্পষ্ট কোনও অসাংবিধানিকতার প্রমাণ দেওয়া যায়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, 'প্রতিটি আইনের ক্ষেত্রেই সাংবিধানিকতার একটি অনুমান থাকে। অন্তর্বর্তীকালীন স্বস্তি পেতে হলে আপনাকে খুব জোরালো ও স্পষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে।'
সর্বোচ্চ আদালতে কেন্দ্র অনুরোধ করে, শুনানি যেন সীমাবদ্ধ থাকে তিনটি বিষয়ে-
১. ওয়াকফ-বাই-ইউজার নীতির সাংবিধানিক বৈধতা
২. কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল ও রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিম মনোনয়নের বৈধতা
৩. সরকারি জমিকে ওয়াকফ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া।
এই শুনানি দেশের সম্পত্তির অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংবিধানিক কাঠামোর উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।