বিচারপতি স্বরণকান্ত শর্মা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, স্বামীর উপার্জনের নেপথ্যে স্ত্রীর যে ‘অদৃশ্য শ্রম’ থাকে, খোরপোশ নির্ধারণের সময় তার গুরুত্ব অপরিসীম (Unemployed wife not idle)।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 23 February 2026 19:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় সমাজে বিয়ের পর মহিলাদের চাকরি ছেড়ে ঘর সামলানো আজও অলিখিত দস্তুর। অথচ বিবাহবিচ্ছেদের মামলা শুরু হলেই সেই শিক্ষিত স্ত্রীকে ‘কুঁড়ে’ তকমা দিয়ে খোরপোশ দিতে অস্বীকার করেন স্বামীরা। এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে সোমবার কড়া অবস্থান নিল দিল্লি হাইকোর্ট (Delhi High Court)। বিচারপতি স্বরণকান্ত শর্মা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, স্বামীর উপার্জনের নেপথ্যে স্ত্রীর যে ‘অদৃশ্য শ্রম’ থাকে, খোরপোশ নির্ধারণের সময় তার গুরুত্ব অপরিসীম (Unemployed wife not idle)।
‘অলস স্ত্রী’ একটি মিথ
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এক মামলার রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, উপার্জনহীন স্ত্রীকে ‘অলস’ মনে করা আসলে ঘরোয়া শ্রম সম্পর্কে অজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ। বিচারপতি শর্মা বলেন, “ঘরের বউ মানেই তিনি ঘরে বসে নেই। তিনি এমন শ্রম দিচ্ছেন যা উপার্জনকামী সঙ্গীকে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে সাহায্য করে। ঘর সামলানো, সন্তান পালন করা এবং পরিবারের জন্য নিজের কেরিয়ার বিসর্জন দেওয়া, এগুলি সবকটিই কাজের রূপ। যদিও এর জন্য কোনও বেতন মেলে না বা ব্যাঙ্কের নথিতে তার উল্লেখ থাকে না, তবু এই অদৃশ্য কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই একটি পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে।”
শিক্ষিত হলেও কি খোরপোশ প্রাপ্য?
মামলাটি ছিল এক দম্পতির, যাঁদের বিয়ে হয়েছিল ২০১২ সালে। ২০২০ সালে স্বামী তাঁর স্ত্রী ও নাবালক সন্তানকে ছেড়ে চলে যান বলে অভিযোগ। নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত মহিলার অন্তর্বর্তীকালীন খোরপোশের আবেদন নাকচ করে দিয়েছিল এই যুক্তিতে যে, তিনি উচ্চশিক্ষিত এবং শারীরিকভাবে সক্ষম হয়েও কাজ করছেন না। স্বামীর দাবি ছিল, উপার্জন করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্ত্রী কেন ‘অলস’ বসে থাকবেন?
এই যুক্তির পাল্টা হাইকোর্ট জানায়, ‘উপার্জন করার ক্ষমতা’ আর ‘প্রকৃত উপার্জন’, দু’টি এক নয়। প্রতিষ্ঠিত আইন অনুযায়ী, শুধুমাত্র শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার কারণে কোনও মহিলাকে খোরপোশ থেকে বঞ্চিত করা যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণ, “বিয়ের পর সংসার বা সন্তানের জন্য যে মহিলা পেশা থেকে দূরে সরে যান, দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর পক্ষে একই পদমর্যাদা বা বেতনে ফের কাজ শুরু করা প্রায় অসম্ভব।”
মামলা নয়, গুরুত্ব পাক মধ্যস্থতা
এদিন বিচারপতি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি জানান, খোরপোশ সংক্রান্ত মামলাগুলি এখন অত্যন্ত ‘শত্রুতামূলক’ লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। স্ত্রীরা প্রায়ই নিজেদের খরচ বাড়িয়ে বলেন, আর স্বামীরা তাঁদের প্রকৃত আয় গোপন করেন। আদালতের মতে, আইনি লড়াইয়ের বদলে ‘মিডিয়েশন’ বা মধ্যস্থতার পথে হাঁটলে স্বামী-স্ত্রী এবং তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে।
তদন্তে মহিলার অতীত বা বর্তমান কোনও উপার্জনের প্রমাণ না পাওয়ায়, হাইকোর্ট তাঁকে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা খোরপোশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের এই রায় সেই সব স্বামীদের জন্য বড় বার্তা, যাঁরা স্ত্রীকে ‘ওয়েল কোয়ালিফায়েড’ বলে খোরপোশের দায় এড়াতে চান। আদালত সাফ জানিয়ে দিল, যে নারী বছরের পর বছর ঘর গোছানোর কাজে নিজের শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করেছেন, বিচ্ছেদের পর তাঁকে আর্থিক সঙ্কটে ফেলে রাখা যায় না।