বুধবার আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, ২০২৩ সালে সনাতন ধর্ম (Sanatana Dharma) নিয়ে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য কার্যত ‘ঘৃণাভাষণ’ (hate speech)-এর পর্যায়ে পড়ে।

উদয়নিধির সনাতন ধর্ম নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের পরপরই বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য একটি নিন্দাজনক ট্যুইট করেছিলেন।
শেষ আপডেট: 21 January 2026 13:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তামিলনাড়ুর উপমুখ্যমন্ত্রী (Deputy Chief Minister) উদয়নিধি স্ট্যালিনের (Udhayanidhi Stalin) বিরুদ্ধে আইনি চাপ আরও বাড়াল মাদ্রাজ হাইকোর্ট (Madras High Court)। বুধবার আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, ২০২৩ সালে সনাতন ধর্ম (Sanatana Dharma) নিয়ে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য কার্যত ‘ঘৃণাভাষণ’ (hate speech)-এর পর্যায়ে পড়ে। একইসঙ্গে হাইকোর্ট বিজেপি নেতা অমিত মালব্যের বিরুদ্ধে করা এফআইআর বাতিল করে দিয়েছে। উদয়নিধির সনাতন ধর্ম নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের পরপরই বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য একটি নিন্দাজনক ট্যুইট করেছিলেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল।
হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চের (Madurai Bench) বিচারপতি এস শ্রীমতী তীব্র ভর্ৎসনার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, গত ১০০ বছর ধরে দ্রাবিড় আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় হিন্দুধর্মের (Hinduism) উপর ‘স্পষ্ট আক্রমণ’ চালানো হয়েছে। আদালতের মতে, উদয়নিধি সেই একই মতাদর্শের উত্তরাধিকার (ideological lineage)-এর অংশ। আদালত আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে, যাঁরা ঘৃণামূলক বক্তব্য শুরু করেন, তাঁরা প্রায়শই শাস্তির বাইরে থেকে যান, অথচ যাঁরা তার প্রতিবাদ করেন, তাঁদেরই আইনের মুখোমুখি হতে হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, দুঃখের সঙ্গে এই আদালত লক্ষ্য করছে, যাঁরা ঘৃণাভাষণ দিতে শুরু করেন, তাঁরা রেহাই পেয়ে গিয়েছেন। কিন্তু যাঁরা তার প্রতিবাদ করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হয়। হাইকোর্ট আরও জানায়, তামিলনাড়ুতে উদয়নিধি স্ট্যালিনের বিরুদ্ধে এখনও কোনও মামলা হয়নি, যদিও অন্য কয়েকটি রাজ্যে (other states) তাঁর মন্তব্য নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেন উদয়নিধি স্ট্যালিন, যিনি মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের (MK Stalin) পুত্র। সেই সভায় তিনি বলেন, কিছু জিনিসের বিরোধিতা করা যায় না, সেগুলোকে নির্মূল করতে হয়। ডেঙ্গু, মশা, ম্যালেরিয়া বা করোনা, এগুলোর বিরোধিতা করা যায় না, এগুলোকে মুছে ফেলতে হয়। ঠিক তেমনই সনাতনের বিরোধিতা নয়, সনাতনকে নির্মূল করতে হবে। তিনি আরও দাবি করেন, সনাতন ধর্ম সামাজিক ন্যায় (social justice) ও সমতার (equality) পরিপন্থী এবং তা জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনকে পাকাপোক্ত করে।
এই মন্তব্যের পর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বিরোধীদের একাংশ দাবি করে, এটি কার্যত সনাতন ধর্ম অনুসারীদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার আহ্বান’ (genocide call)। যদিও উদয়নিধি পরে সেই ব্যাখ্যা নাকচ করেন। তবে মাদ্রাজ হাইকোর্ট বুধবার স্পষ্ট জানায়, উদয়নিধির ব্যবহৃত শব্দবন্ধ বাস্তব অর্থেই গণহত্যার ইঙ্গিত বহন করে এবং তা ঘৃণাভাষণের মধ্যেই পড়ে। আদালতের বক্তব্য, যদি সনাতন ধর্ম অনুসারীদের অস্তিত্বই না থাকার কথা বলা হয়, তবে তার উপযুক্ত শব্দ হল ‘গণহত্যা’ (genocide)। যদি সনাতনকে একটি ধর্ম ধরা হয়, তবে তা ‘ধর্মহত্যা’ (religicide)। এর মধ্যে পরিবেশ ধ্বংস (ecocide), তথ্য ধ্বংস (factocide) ও সংস্কৃতি ধ্বংস (culturicide) সবই অন্তর্ভুক্ত। তাই তামিল শব্দ ‘সনাতানা ওঝিপ্পু’ (Sanathana Ozhippu) স্পষ্টভাবে গণহত্যা বা সাংস্কৃতিক গণহত্যাকেই বোঝায়। আদালত আরও বলে, এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কোনও পোস্টকে ঘৃণাভাষণ বলা যায় না।
দেশজুড়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়লেও উদয়নিধি নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তিনি বলেন, তিনি তাঁর বক্তব্যে ‘অটল’ রয়েছেন, তবে সেটিকে কোনওভাবেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে শারীরিক নিধনের ডাক হিসেবে দেখা উচিত নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) উদয়নিধির বিরুদ্ধে ফৌজদারি পদক্ষেপ চেয়ে দায়ের হওয়া তিনটি রিট আবেদন খারিজ করে দেয়।
তবে মাদ্রাজ হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণ এমন এক সময়ে এল, যখন তামিলনাড়ুর রাজনীতি (Tamil Nadu politics) ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত। চলতি বছরের মে মাসের আগেই রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন (Assembly elections) হওয়ার কথা, তার আগে এই রায় উদয়নিধি স্ট্যালিন ও ডিএমকে (DMK)-র জন্য বড় রাজনৈতিক অস্বস্তি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।