রাজ্যের তরফে কর্মী দেওয়ার কথা শোনার পর প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে বলেন, “সমস্যা তো এখানেই। কর্মী দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাঁদের নামের তালিকা কোথায়? আমরা তো বলেছিলাম, বাংলা জানা কর্মী প্রয়োজন।”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী জানান, জেলাভিত্তিক বিবরণ আগেই দেওয়া হয়েছিল। তবে কমিশনের আইনজীবী সেই দাবি নাকচ করে বলেন, ওই সংক্রান্ত কোনও তথ্য তাঁদের হাতে পৌঁছয়নি।
এই অবস্থায় বিতর্কে না গিয়ে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “এই বিষয় নিয়ে আর তর্ক চাই না। নামের তালিকা সংক্রান্ত বিষয়টি পরিষ্কার করতে আমাদের মুখ্যসচিবকে ডেকে পাঠাতে হবে।”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দাবি করেন, রাজ্যের কাছে কর্মীদের নামের তালিকা রয়েছে এবং সব গ্রুপ ‘বি’ অফিসারই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি জানতে চান, সেই তালিকা কমিশনের হাতে আদৌ তুলে দেওয়া হয়েছে কি না।
উত্তরে মমতার আইনজীবী জানান, প্রত্যেকের নাম-সহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে কিছুটা সময় লাগবে। তখনই প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, এর অর্থ হল কর্মীদের নামের তালিকা এখনও সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়। সেই অবস্থায় ওই কর্মীরা কীভাবে ডিইও-র কাছে রিপোর্ট করবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবীকে উদ্দেশ করে প্রধান বিচারপতি জানতে চান, ওই ৮,৫০০ অফিসার আদৌ আগামী দিনের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইআরও-দের কাছে রিপোর্ট করতে পারবেন কি না। পাশাপাশি এইআরও-রা রাজ্য সরকারের আধিকারিক কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
জবাবে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এইআরও-রা রাজ্য সরকারের আধিকারিক এবং তাঁদের পদমর্যাদা মাইক্রো অবজার্ভার থেকেও নীচে। পরে বিচারপতি বাগচি প্রশ্ন করেন, এইআরও-রা গ্রুপ ‘এ’ না গ্রুপ ‘সি’ অফিসার। তার উত্তরে অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি জানান, ২৯৪ জন ইআরও স্তরের অফিসার গ্রুপ ‘এ’ শ্রেণির।
- সুপ্রিম কোর্টে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রয়োজনীয় অফিসারদের ধরন উল্লেখ করে তারা মোট পাঁচটি চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মী কমিশনকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
- প্রধান বিচারপতি কান্ত স্পষ্ট করেন, প্রয়োজন হলে আদালত উপযুক্ত নির্দেশ দেবে। তবে এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনও রকম প্রতিবন্ধকতা মেনে নেওয়া হবে না—এই বার্তা সব রাজ্যের উদ্দেশেই পরিষ্কার করে দেন তিনি।
- রাজ্য সরকারের পক্ষে সিঙ্ঘভি দাবি করেন, কমিশন কখনও গ্রুপ ‘বি’ অফিসার চায়নি। তবে কমিশনের আইনজীবী সেই বক্তব্য খণ্ডন করে জানান, তাঁদের প্রয়োজন ছিল ৩০০ জন গ্রুপ ‘বি’ অফিসার। বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র ৮০ জন, বাকি কর্মীরা গ্রুপ ‘সি’ ও অন্যান্য শ্রেণির বলে আদালতকে জানানো হয়।
প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা করেন, মাইক্রো অবজার্ভারদের ভূমিকা হল ইআরও ও এইআরও-কে সহায়তা করা। রাজ্যের অফিসাররা যুক্ত হলে তাঁরাও মতামত দিতে পারবেন, যা ইআরও-র সিদ্ধান্তকে আরও শক্ত ভিত দেবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এজলাসে মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দিওয়ান অভিযোগ করেন, নামের বানানে গরমিল দেখিয়ে ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ারই উদ্দেশ্য নেওয়া হচ্ছে।
প্রধান বিচারপতি বলেন, রাজ্যের অফিসাররা মঙ্গলবার যোগ দিতে পারেন, তবে তাঁদের নথি দেখার সুযোগ দেওয়া হোক, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সহজ হয়। বিচারপতি বাগচি কমিশনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, নোটিস মূলত ‘ম্যাপড’ ভোটারদের জন্য, কিন্তু সফটওয়্যারের কারণে নামের সামান্য পার্থক্য থাকলেই ডেকে পাঠানো হচ্ছে। উদাহরণ দেন, বাংলার পরিবারে ‘কুমার’ মধ্যনাম হিসেবে সাধারণ; তা বাদ পড়লেও নোটিস পাঠানো হচ্ছে।
বিচারপতি বাগচি মন্তব্য করেন, সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিস্তৃতভাবে নোটিস পাঠানো হলেও বাস্তবতার সঙ্গে তা মেলে না। উদাহরণ হিসেবে বলেন, ৫০ বছরের ব্যবধানকে দাদু-নাতির সম্পর্ক ধরে নেওয়া হচ্ছে, অথচ বাস্তবে বিয়ে হয় প্রায় ২০ বছরের বয়সেও। সফটওয়্যার এই বাস্তব পার্থক্যগুলো বিবেচনা করছে না।
বিচারপতি বাগচি কমিশনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, কিছু পরিবারে ৫–৬ সন্তান থাকলেও ৫০ বছর হলে নোটিস পাঠানো যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। কিন্তু যেই সফটওয়্যার টুল ব্যবহার করা হয়েছে, তা অত্যন্ত কঠোরভাবে কাজ করছে।
সুপ্রিম কোর্টে কমিশন জানান, রাজ্যের দেওয়া ৮,৫০০ অফিসারকে প্রশিক্ষণ ছাড়া কাজে নেওয়া কঠিন, কারণ ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ সময়। প্রধান বিচারপতি বলেন, এই অফিসাররা আগামিকালই রিপোর্ট করে কাজে যোগ দিতে পারে। তবে কমিশনের আইনজীবী জোর দিয়ে বলেন, আগে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, না হলে তাঁরা দায়িত্ব ঠিকভাবে বুঝতে পারবে না।
প্রধান বিচারপতি জানান, অফিসাররা কেবল সহায়তা করবেন, সিদ্ধান্ত নেবেন না। কমিশনের আইনজীবী বলেন, আগে এই কর্মীদের প্রোফাইল দেখা হবে, তারপর প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়ক হিসেবে কাজে লাগানো হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দাবি করেন, নামের বানান ভুলের কারণে ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া উচিত নয় এবং কমিশনকে এ সংক্রান্ত নির্দেশ দিতে হবে। প্রধান বিচারপতি বলেন, এই মুহূর্তে এমন কোনও নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী আরও যোগ করেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে এবং তার পর আর আপিলের সুযোগ থাকবে না, তাই ভোটাররা যেন বাদ না পড়ে— এটাই তাদের প্রধান উদ্বেগ।
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী দিওয়ান অভিযোগ করেন, মাইক্রো অবজার্ভারদের ইআরও ও এইআরও-র সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত কিনা মার্ক করতে বলা হচ্ছে। এতে তারা কার্যত বেআইনি ক্ষমতা পাচ্ছেন, যা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কমিশনের আইনজীবী আদালতে জানান, রাজ্য তাঁদের নির্দেশ মেনে চলছে না, সাসপেন্ড বা এফআইআর কার্যকর করছে না এবং প্রতিটি পদক্ষেপে অসহযোগিতা করছে।
সুপ্রিম কোর্টে মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন নিয়ে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, এতে কিছু অস্বাভাবিক নেই; এটি সংবিধানের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রকাশ। তিনি বলেন, এই বিষয়কে রাজনীতিকরণ করা উচিত নয়।
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, রাজ্য নিশ্চিত করবে ৮,৫০৫ জন গ্রুপ ‘বি’ অফিসার হিসেবে নিযুক্ত। মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে তাঁরা সংশ্লিষ্ট ডিইও বা ইআরও-র কাছে রিপোর্ট করে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কমিশন প্রয়োজনে ইআরও ও এইআরও-দের পরিবর্তন করতে পারবে বা যোগ্য মনে হলে বর্তমান অফিসারদের কাজে রাখবে।
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, কমিশন প্রয়োজনে ইআরও ও এইআরও-দের পরিবর্তন করতে পারবে বা যোগ্য অফিসার ব্যবহার করতে পারবে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ইআরও-রাই, মাইক্রো অবজার্ভার ও অন্যান্য অফিসার কেবল সহায়তা করবেন। রাজ্যের অফিসারদের দু’দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে কমিশন।
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ১৪ ফেব্রুয়ারির পর ইআরও-দের নথি যাচাই ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আরও এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে। এছাড়া, রাজ্যে এনুমারেশন ফর্ম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার জন্য এখনও কোনো এফআইআর হয়নি। আদালত রাজ্যের পুলিশের ডিজি-কে শোকজ করে, তাকে হলফনামা জমা দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।