স্বাধীনতোত্তর ভারত পরবর্তী ও আধুনিকোত্তর ভারতের পূর্ববর্তী এক ঐতিহাসিক এবং সংকটপূর্ণ নড়বড়ে সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাও। গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 28 June 2025 13:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের সংস্কারমুখী অর্থনীতির নিঃশব্দ রূপকার পিভি নরসিমা রাও। পুরো নাম পি আমুলাপর্তি বেঙ্কট নরসিমা রাও। বর্তমানে তেলঙ্গানা, তৎকালীন হায়দরাবাদ রাজ্যের একটি ছোট্ট গ্রামে তেলুগু নিয়োগী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। যিনি দেশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রচারবিমুখ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। স্বাধীনতোত্তর ভারত পরবর্তী ও আধুনিকোত্তর ভারতের পূর্ববর্তী এক ঐতিহাসিক এবং সংকটপূর্ণ নড়বড়ে সাঁকোর উপর দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। যিনি তাঁর মেধা, বুদ্ধিমত্তা ও শাণিত চাণক্যবুদ্ধির দ্বারা দেশের রক্ষণশীল অর্থনীতিকে মুক্ত বাতাসে ডানা মেলে উড়তে সাহায্য করেছিলেন, সেই প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাওয়ের আজ, শনিবার জন্মদিন।
নরসিমা রাওয়ের জন্মদিনে এদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সহ দলমতনির্বিশেষে সকলেই শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে ছাত্র বয়স কাটিয়ে স্বাধীনতার পরে জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থেকেই তিনি তাঁর সহযোগী তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে দেশের অর্থনীতিকে বদ্ধ জলাশয় থেকে তুলে এনে খোলা আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বাজারি অর্থনীতির অসীমতায়। সেই প্রথম ভারত বিশ্ববাজারে মুক্ত অর্থনীতির দরজা খুলে দিল।
নরসিমা রাওই হলেন দেশের প্রথম দক্ষিণ ভারতীয় ও দ্বিতীয় অ-হিন্দিভাষী প্রধানমন্ত্রী। এবং নেহরু-গান্ধী পরিবারের বাইরে প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি মেয়াদ পূর্ণ করেছেন। তাঁর জমানাতেই দেশে ঘটেছে অর্থনৈতিক সংস্কার, বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও ১৯৯৩ সালের লাতুরের ভয়াবহ ভূমিকম্প। অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য পিভি নরসিমাকে ভারতের অর্থনীতি সংস্কারের জনক বলা হয়ে থাকে। ১৯৯১ সালে লাইসেন্সরাজের পতন ঘটিয়ে বাজারমুখী অর্থনীতির পত্তন করেন তিনি ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী তথা তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁদের মিলিত প্রয়াসে দেশের ডুবন্ত অর্থনীতি নতুন সূর্যোদয় দেখে।
এত কিছু সত্ত্বেও বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও তার পরবর্তী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার ভয়াবহ কলঙ্কের দাগ লাগে তাঁর জামায়। এছাড়াও লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ভোটের বদলে নগদ কেলেঙ্কারিতে দুর্নাম জোটে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের কপালে। এমনকী শেয়ার বাজারে কেলেঙ্কারির অভিযোগ রাও জমানার ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। তাঁর বিভিন্ন অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁকে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করার কথা ঘোষণা করেন।
রাজনৈতিক ইতিহাসবিদদের লেখা থেকে জানা যায়, মহাত্মা গান্ধী পরবর্তী কংগ্রেস দল পুরোপুরি নেহরু পরিবারভিত্তিক হয়ে যায়। পণ্ডিত নেহরু ও তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী সমান্তরালভাবে কংগ্রেস শাসন করতে শুরু করেন। দেশের বিভিন্ন অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেওয়া হতো এই পরিবারেরই অন্দর মহল থেকে। যা নিয়ে চরম অসন্তুষ্ট ছিলেন বহু প্রবীণ নেতা। নেহরুর সময়কাল থেকেই দলের বিরুদ্ধে একটা পাল্টা নেতৃত্ব তৈরি করে রেখেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। যার ফলশ্রুতি দেখা দেয়, নেহরুর মৃত্যুর পরেই।
ফলে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ইন্দিরা প্রধানমন্ত্রী না হতে পারলেও তাঁর রাজনৈতিক দাবার চালে শেষপর্যন্ত কংগ্রেস তাঁকেই দলনেত্রী নির্বাচন করে। এবং মোক্ষম ফল হয় কংগ্রেসের ভাঙনে। কিন্তু, সেই সময় পিভি নরসিমা রাও কৌশলগত কারণে থেকে যান ইন্দিরা শিবিরেই। এমনকী জনতা দল গঠন ও জরুরি অবস্থার সময়েও তিনি ইন্দিরার বিশ্বস্ততা অর্জনে সক্ষম ছিলেন।
কংগ্রেসের ভিতরে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয় ইন্দিরা গান্ধীর আকস্মিক প্রয়াণে। সেই সময় অনেকেই তরুণ, রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ রাজীব গান্ধীকে দলনেতা মানতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু, লোকসভা ভোটে সমস্ত পার্টিকে ধুয়েমুছে দিয়ে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী পদে বসেন। তাবড় শীর্ষ ও অভিজ্ঞ নেতাদের অনেককেই বাইরে রেখে তরুণ প্রজন্মের মন্ত্রিসভা গঠন করেন রাজীব। এরপর থেকেই পিভি নরসিমা রাওয়ের সঙ্গে ১০ জনপথের দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। যা শেষদিন পর্যন্ত টিকে ছিল। যদিও পরিস্থিতির চাপে সনিয়া গান্ধীকে মেনে নিতে হয়েছিল রাওয়ের প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচন।