পুলিশের দাবি, এই খুন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না। ঘটনার ১৬ দিন আগে অঞ্জলি সাদুলশহরে নিজের বাপের বাড়িতে যান। সেখানেই সঞ্জয়ের সঙ্গে বসে আশীষকে সরানোর ছক চূড়ান্ত হয়।

শেষ আপডেট: 6 February 2026 12:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরে যে মৃত্যুকে প্রথমে 'হিট-অ্যান্ড-রান' দুর্ঘটনা (Sri Ganganagar hit and run twist) বলা হয়েছিল, তদন্ত কিছুটা এগোতেই প্রকাশ্যে এসেছে পরিকল্পিত খুনের (Rajasthan murder case) ভয়াবহ অভিযোগ। অভিযোগ, ২৩ বছরের এক মহিলা তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বামীকে খুনের ছক কষেছিলেন। এই ঘটনা ফের একবার মনে করিয়ে দিল গত বছর ঘটে যাওয়া মেঘালয়ে হানিমুন হত্যাকাণ্ডের (Meghalaya honeymoon Raja Raghuvanshi murder) কথা।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের চাপে হওয়া এই বিয়ে নিয়ে খুশি ছিলেন না অভিযুক্ত অঞ্জলি কুমার। এদিকে অন্য এক যুবকের সঙ্গে তাঁর সাত বছরের সম্পর্ক ছিল। তাই পথের কাঁটা সরাতেই প্রেমিকের সঙ্গে মিলে স্বামী আশীষ কুমার (২৭)-কে খুন করেন তিনি (Rajasthan planned murder by wife and lover)। এই মামলায় এখনও পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনায় আশীষের মৃত্যু হয়। প্রথমে অঞ্জলি পুলিশকে জানান, সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরিয়েছিলেন তাঁর স্বামী, সেই সময় একটি দ্রুতগতির মোটরবাইক পিছন থেকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায়।
প্রথমে সব কিছু পরিকল্পনামাফিকই এগোচ্ছিল। কিন্তু ময়নাতদন্তে এমন কিছু আঘাতের চিহ্ন ধরা পড়ে, যা পথদুর্ঘটনার সঙ্গে মেলেনি। সেখান থেকেই তদন্তের মোড় ঘুরে যায় এবং শেষমেশ পুলিশি জেরায় সামনে আসে স্বীকারোক্তি।
সাত বছরের সম্পর্ক, পরিবারের অমতে অন্যত্র বিয়ে
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অঞ্জলি ও আশীষের বিয়ে হয় গত বছরের অক্টোবর মাসে। কিন্তু বিয়ের অনেক আগে থেকেই অঞ্জলির সঙ্গে সঞ্জয় (২৫) নামের এক যুবকের সম্পর্ক ছিল, তাও প্রায় সাত বছর।
শ্রীগঙ্গানগরের পুলিশ সুপার অমৃতা দুহন বলেন, “অঞ্জলির পরিবার তাঁদের সম্পর্কের কথা জানত। তবুও আশীষের সঙ্গে জোর করেই তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়েতে অসন্তুষ্ট থাকায় অঞ্জলি গোটা খুনের পরিকল্পনা করে।”
তদন্তে উঠে এসেছে, অঞ্জলি এবং সঞ্জয়, দুজনেই চুরু জেলার সাদুলশহরের বাসিন্দা। শ্রীগঙ্গানগরের রাওলা এলাকার একটি কলেজে গ্র্যাজুয়েশনের সময় তাঁদের পরিচয় হয় এবং বিয়ের পরেও সম্পর্ক বজায় ছিল।
খুনের ছক পাকাপাকি হয় ঘটনার ১৬ দিন আগে
পুলিশের দাবি, এই খুন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না। ঘটনার ১৬ দিন আগে অঞ্জলি সাদুলশহরে নিজের বাপের বাড়িতে যান। সেখানেই সঞ্জয়ের সঙ্গে বসে আশীষকে সরানোর ছক চূড়ান্ত হয়।
এছাড়া, রোহিত ও সিদ্ধার্থ নামে আরও দু’জনকে যুক্ত করা হয়, যারা ঘটনার কয়েক দিন আগে জায়গা পরিদর্শন (রেকি) করে যায়।
তদন্তকারীদের দাবি, অঞ্জলি উচ্চশিক্ষার জন্য রাওলার সেই পুরনো কলেজে ফেরার অনুমতি স্বামীর কাছে চেয়েছিলেন, সেখানেও আসল উদ্দেশ্য ছিল সঞ্জয়ের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করা। কিন্তু আশীষ তাতে রাজি হননি। শেষমেশ তাঁকে সরানোর ছক কষেন অভিযুক্তরা।
উল্লেখযোগ্য, আশীষ মৃত্যুর মাত্র তিন দিন আগে একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
যেভাবে খুন, তারপর ‘ডাকাতি’র নাটক
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় অঞ্জলি হাঁটার অজুহাতে আশীষকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। আগেভাগেই সঞ্জয়কে খবর দেওয়া ছিল।
পুলিশ সুপার জানান, “ওই জায়গায় পৌঁছতেই সঞ্জয় ও তাঁর সঙ্গীরা লাঠি-রড দিয়ে আশীষের উপর হামলা চালায়। তিনি অচেতন হয়ে পড়লে সঞ্জয় শ্বাসরোধ করে তাঁকে মেরে ফেলে। ময়নাতদন্তে মাথায় গভীর আঘাত ও শ্বাসরোধের চিহ্ন পাওয়া যায়।”
এরপর ঘটনাকে ডাকাতি বলে দেখাতে অঞ্জলি নিজের কানের দুল ও আশীষের মোবাইল ফোন অভিযুক্তদের হাতে তুলে দেন। ঘটনাস্থলের কাছেই তিনি অচেতন হওয়ার ভান করেন।
অঞ্জলির অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ প্রথমে অবহেলায় গাড়ি চালানোর মামলা রুজু করে এবং অজ্ঞাত বাইক আরোহীর খোঁজ শুরু হয়। আশীষের দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়।
ময়নাতদন্তেই ফাঁস সত্য
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসতেই ‘হিট-অ্যান্ড-রান’ তত্ত্ব ভেঙে পড়ে। একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং শ্বাসরোধের প্রমাণ মেলে। কোনও পথদুর্ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
তারপর অঞ্জলিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। বুধবারের জেরায় তিনি নিজের ভূমিকার কথা স্বীকার করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযুক্ত চারজন অঞ্জলি, সঞ্জয়, রোহিত ও সিদ্ধার্থকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর প্রাসঙ্গিক ধারায় খুনের মামলা রুজু করে তদন্ত চলছে।