আপাতত জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এক বছর ধরে ওই অঞ্চলের ডলফিন ও কচ্ছপের গতিবিধি নিয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে। সেই রিপোর্ট হাতে আসার পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। পুরীর স্বপ্নের বিমানবন্দর এখন স্রেফ পরিবেশ বনাম উন্নয়নের এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়ে।

প্রস্তাবিত শ্রী জগন্নাথ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রকল্প
শেষ আপডেট: 10 April 2026 19:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পুরীর জগন্নাথ ধামে (Puri Jagannath Dham) পর্যটন ও যাতায়াতের সুবিধার জন্য প্রস্তাবিত শ্রী জগন্নাথ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Puri shree Jagannatha International Airport) প্রকল্প নিয়ে এবার বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII)। সংস্থার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এই বিমানবন্দর প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ওড়িশার উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হতে পারে। এমনকি বিলুপ্তপ্রায় অলিভ রিডলি কচ্ছপ (threat to Olive Ridley turtles Puri airport) এবং লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী পাখির জীবনও বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে (Chilika lake migratory birds aviation risk)।
কেন এই প্রকল্প বাতিলের সুপারিশ (WII recommends rejection of Puri international airport)?
ব্রহ্মগিরি তহসিলের সিপাসুরুবালি গ্রামে প্রায় ৪৭১ হেক্টর জমির ওপর এই গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরটি তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু WII-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সাইটটি সমুদ্র উপকূল থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘নো-ডেভেলপমেন্ট’ জোনের মধ্যে পড়ে।
সবথেকে বড় কথা, এটি বালুখণ্ড-কোনার্ক বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের একেবারে কাছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিল্কা হ্রদ (Ramsar Site) থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। ফলে এখান দিয়ে বিমান চলাচল করলে বড়সড় বিপদের সম্ভাবনা থাকছে।
রিপোর্টে চিল্কা হ্রদ এবং পরিযায়ী পাখিদের যাতায়াতের করিডোর বা ‘সেন্ট্রাল এশিয়ান ফ্লাইওয়ে’-র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান যখন ২,০০০ ফুটের নিচে থাকে, তখন ‘বার্ড স্ট্রাইক’ বা পাখির সঙ্গে বিমানের সংঘর্ষের ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ বেড়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইথিওপিয়ার মতো দেশে জলাভূমির কাছে বিমানবন্দরের কারণে প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনার উদাহরণ টেনে WII জানিয়েছে, চিল্কার কাছাকাছি বিমানবন্দর তৈরি করা মানেই বিমান ও পাখি, উভয়েরই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া।
অলিভ রিডলি ও ডলফিনের বসতি
শুধু আকাশ নয়, স্থলের প্রাণীদের নিয়েও রয়েছে গভীর উদ্বেগ। প্রস্তাবিত এলাকার মাত্র ২.৩ কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে সংরক্ষিত অলিভ রিডলি কচ্ছপের প্রজনন ক্ষেত্র। উপকূলীয় এই অঞ্চলটি ইরাবতী ডলফিনেরও অন্যতম বিচরণ পথ। বিমানবন্দর তৈরি করতে গিয়ে যে ১৩,৫০০ গাছ কাটার পরিকল্পনা রয়েছে, তা ওড়িশার উপকূলের জন্য এক বিশাল ‘বায়ো-শিল্ড’ বা প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই গাছগুলো না থাকলে ঘূর্ণিঝড় বা নোনা জলের অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
আইনি জটিলতা ও গোপনীয়তার অভিযোগ
WII-এর রিপোর্টে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রকল্পের ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য অনেক তথ্য গোপন করা হয়েছে। একটি ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে এবং সংযোগকারী রাস্তার তথ্য মূল প্রস্তাবে রাখা হয়নি যাতে সহজেই ছাড়পত্র পাওয়া যায়। এমনকি বন দফতরের প্রয়োজনীয় অনুমতি মেলার আগেই সেখানে সীমানা প্রাচীর তুলে বন সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ কী?
ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট দুটি পথ খোলা রেখেছে - হয় বাস্তুতন্ত্রের স্বার্থে এই প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল করা হোক, নাহলে প্রকল্পটি ‘অপরিহার্য’ হলে ১০টি কঠোর শর্ত মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে রাডার-ভিত্তিক বার্ড ডিটারেন্ট সিস্টেম ব্যবহার এবং কচ্ছপদের সুবিধার্থে বিশেষ আলোর ব্যবস্থা।
আপাতত জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এক বছর ধরে ওই অঞ্চলের ডলফিন ও কচ্ছপের গতিবিধি নিয়ে সমীক্ষা চালাচ্ছে। সেই রিপোর্ট হাতে আসার পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার। পুরীর স্বপ্নের বিমানবন্দর এখন স্রেফ পরিবেশ বনাম উন্নয়নের এক কঠিন লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়ে।