সোশ্যাল মিডিয়ায় মেঘালয় ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির ‘অশিক্ষিত-জংলি’ বাসিন্দাদের ঘাড়ের উপর পড়েছিল খুনের দায়।

সোনম ও রাজা রঘুবংশী। ফাইল ছবি।
শেষ আপডেট: 10 June 2025 12:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মধুচন্দ্রিমায় খুন! একটি হত্যাকাণ্ড। যার সঙ্গে জড়িত তিন রাজ্যের পুলিশ। মধ্যপ্রদেশের তরুণ ব্যবসায়ী রাজা রঘুবংশী খুনে এসবের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে জাতিবিদ্বেষী ঘৃণার বাগবিতণ্ডা। মেঘালয়ে বেড়াতে গিয়ে নবদম্পতি রাজা রঘুবংশী ও তাঁর নবপরিণীতা স্ত্রী সোনমের নিখোঁজ হওয়া এবং তারপর স্বামীর দেহ উদ্ধারের পরেও স্ত্রীর হদিশ না মিলতে থাকার মধ্যবর্তী সময়ে গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতকে সহ্য করতে হয়েছে উত্তর ভারতীয়দের ঘৃণাভাষণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় মেঘালয় ও পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির ‘অশিক্ষিত-জংলি’ বাসিন্দাদের ঘাড়ের উপর পড়েছিল খুনের দায়।
আর এখন খুনের তদন্ত যখন সম্পূর্ণ উল্টোদিকে মোড় নিয়েছে, তখন সেই মেঘালয় সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষ দেশবাসীর ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন। তাঁরাও সোশ্যাল মিডিয়ায় এবার গলা ফাটিয়ে, বুক বাজিয়ে বলে বেড়াচ্ছেন যে, দেশের সাত বোনের এই টুকরো অঞ্চলের মানুষ মোটেও হৃদয়হীন নয়। তাঁদের বিরুদ্ধে যে ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে, তার জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত সকলের। কারণ, প্রাথমিকভাবে এটা অন্তত প্রমাণ হয়ে গিয়েছে যে, খুনি যে বা যারাই হোক না কেন, নিদেনপক্ষে মেঘালয়ের কোনও কেউ এই কাজ করেনি। এমনকী তামাম উত্তর-পূর্ব ভারতকে এই কাজের দোষী ঠাউরে আগাম গালমন্দ করাও ঠিক হয়নি। তাই যাঁরা এই কাজ করেছেন, তাঁদের এখনই প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত। কারণ তাঁদের এই কাজ উত্তর-পূর্বের পার্বত্য এলাকার মানুষের আত্মাভিমান, আদিবাসী সংস্কৃতি, আতিথেয়তার পরম্পরা বোধে আঘাত করেছে। বিশেষ করে আঘাত করেছে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পে।
নবদম্পতির নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে রাজার দেহ উদ্ধার এবং তারপরেও সোনমের হদিশ না মিলতে থাকায় গোটা আক্রোশ আছড়ে পড়ে মেঘালয়ের মানুষের উপর। যদিও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা প্রথমদিন থেকেই বলে আসছেন, এই ঘটনায় যে বা যারা দোষী, তাদের আদালতের চৌকাঠে হাজির করবেই পুলিশ। কিন্তু, যুক্তিতর্কের ধার না ধেরে বিদ্বেষ ও ঘৃণামূলক প্রচার চলতে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুধু মেঘালয় নয়, অরুণাচল প্রদেশ এবং সিকিমকে বাদ রেখে বিভিন্ন ধরনের কুরুচিকর, অশ্রাব্য, অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ শুরু হয়ে যায় নেট দুনিয়ায়।
অনেকে বলতে শুরু করেন, মেঘালয়ে বেড়াতে যাওয়া বিপজ্জনক। কেউ কেউ মেঘালয়ের সঙ্গে এই অঞ্চলকেই জুড়ে দিয়ে লেখেন, অসভ্য, আদিবাসী, জংলিরা বাস করে এখানে। একটি সংবাদমাধ্যমকে মুখ্যমন্ত্রীও বলেন, রাজ্যের মুখ কালো হয়ে গিয়েছে। আমরা যা করার তা করব। আমাদের সরকারের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। কোনও অভিযুক্তই মেঘালয়ের বাসিন্দা নয়।
শিলংয়ের সুশীল সমাজের সংগঠন দ্য কনফেডারেশন অফ মেঘালয় সোশ্যাল অর্গানাইজেশন এই ঘটনায় সোনম রঘুবংশীর পরিবারের কাছে ক্ষমা দাবি করেছে। সংস্থার সভাপতি সোনমের পরিবারের সমালোচনা করে বলেন, ওরা অবাস্তব কল্পনার উপর নির্ভর করে সরকার ও পুলিশকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। তাদের মন্তব্য স্থানীয় মানুষের প্রতি ঘৃণামূলক এবং অন্যায্য আক্রমণ। এখন সত্য ফাঁস হয়ে গিয়েছে। ওদের ক্ষমা চাওয়া উচিত। শুধু সরকার বা পুলিশের কাছে নয়, মেঘালয়ের তামাম মানুষের কাছে ওরা অপরাধী।
এর আগে উত্তর বা মধ্য ভারতের কেউ লিখেছিলেন, উত্তর-পূর্ব ভরে রয়েছে উগাবুগা জংলিতে। কেউ ওখানে যাবেন না। আরেকজন লিখেছিলেন, উত্তর-পূর্বকে এই কারণেই অবহেলা করে ভারতের বাকি অংশ। এখানে অনেক দল এখনও সক্রিয় রয়েছে, যারা লুট করার জন্য মানুষ খুন করে। অনেকে এ পর্যন্তও বলেছেন, এই এলাকাকেই ভারত থেকে সরিয়ে ফেলতে। উত্তর-পূর্বের আদিবাসীরা বন্য, তাদের মুছে ফেলা উচিত। কেউ কেউ বলেন, এখানকার মানুষ বুনো প্রকৃতির, নরখাদক এবং মানব পাচারকারী।
এখন সেই মেঘালয়ের মানুষই তুলনামূলক অনেক ভদ্রভাষায় লিখছেন, তান্ত্রিক জাদুটোনার জন্য নয়, এই রাজ্য বিখ্যাত অসংখ্য লিভিং রুট ব্রিজের জন্য। ঔপনিবেশিক সভ্যতা-সংস্কৃতি-স্থাপত্যে প্রখ্যাত শিলংয়ের জন্য। চেরাপুঞ্জির অপূর্ব সৌন্দর্যের কারণে। মেঘালয় নিরাপদ নয়, তন্ত্রসাধনা, স্থানীয়রা বিপজ্জনক আরও কী না বলা হয়েছে, আমাদের নামে। যাঁরা বলেছেন, তাঁরা এখনই ক্ষমা চেয়ে নিন। আপনাদের কথায়, শুধু আমাদের সম্মান নষ্ট হয়নি, আমাদের পর্যটনের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।