ভারতীয় বায়ুসেনা (Indian Air Force) আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করলেও যে তারা পাকিস্তানের কিরানা হিলস (Kirana Hills)-এ হামলা চালায়নি, কুপারের দাবি একেবারে উল্টো। তাঁর বক্তব্য, এই ঘাঁটিই পাকিস্তানের প্রধান পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোর একটি এবং সেখানে ভারতের হামলা হয়েছিল।

কিরানা হিলস যে পারমাণবিক ঘাঁটি, তা নিয়ে কুপারের সন্দেহ নেই। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের একদল পরমাণু বিজ্ঞানীর বুলেটিনেও এই জায়গাকে পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শেষ আপডেট: 18 February 2026 12:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অপারেশন সিন্দুর (Operation Sindoor) চলাকালীন ভারতের একটি নির্দিষ্ট হামলাই কি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে যুদ্ধবিরতির পথে ঠেলে দিয়েছিল—এই প্রশ্নটি গত এক বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে কূটনৈতিক ও সামরিক মহলে। বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা বিমান যুদ্ধ-বিশেষজ্ঞ ও সামরিক বিশ্লেষক Tom Cooper বলছেন, এই বিতর্কের চূড়ান্ত উত্তর তিনি দিয়ে ফেলেছেন। ভারতীয় বায়ুসেনা (Indian Air Force) আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করলেও যে তারা পাকিস্তানের কিরানা হিলস (Kirana Hills)-এ হামলা চালায়নি, কুপারের দাবি একেবারে উল্টো। তাঁর বক্তব্য, এই ঘাঁটিই পাকিস্তানের প্রধান পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোর একটি এবং সেখানে ভারতের হামলা হয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘ওখানে হামলার পর পাকিস্তান কার্যত শেষ হয়ে গিয়েছিল।’
এনডিটিভির (NDTV) প্রতিরক্ষা বিষয়ক সম্পাদক শিব আরুরকে (Shiv Aroor) দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কুপার বলেন, “এমন জায়গাতেই আঘাত করা হয়, যেখানে বার্তা স্পষ্ট, কিন্তু ক্ষতি নিয়ন্ত্রিত। এর মানে দাঁড়ায়—পাকিস্তানের বন্ধুরা, আমরা চাইলে যেখানে খুশি, যতবার খুশি, যত অস্ত্র চাই ব্যবহার করে আঘাত করতে পারি। এবার থামো।” তিনি আরও বলেন, “হামলার সময়ের সঙ্গে যদি কূটনৈতিক পটভূমি মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে দেখা যাবে ইসলামাবাদ (Islamabad) তখন ওয়াশিংটন (Washington) ও নয়াদিল্লিকে (New Delhi) ফোন করে যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানাচ্ছিল। সরাসরি ‘ভিক্ষা’ বলা না গেলেও বাস্তবে সেটাই ছিল। এখন আর কোনও ধোঁয়াশা নেই।”
কুপারের দাবি, তাঁর হাতে একাধিক প্রমাণ রয়েছে। পাকিস্তানি নাগরিকদের তোলা ভিডিওতে নাকি দেখা যায় আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ধোঁয়ার রেখা, পাহাড়ের দিকে সোজা নেমে গিয়ে বিস্ফোরণ। তিনি বলেন, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর (Pakistan Air Force) ৪০৯১ নম্বর স্কোয়াড্রনের রাডার স্টেশন থেকেও ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। “প্রথমে রাডার স্টেশনগুলো ধ্বংস করে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অচল করা হয়। তারপর ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারের অন্তত দু’টি প্রবেশপথে আঘাত করা হয়। কিরানা হিলস পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির অন্যতম কেন্দ্র। সেখানে ২০ থেকে ২৪টি নন-ক্রিটিক্যাল পারমাণবিক পরীক্ষা হয়েছে। এটা কোনও বিনোদন পার্ক নয়,” বলেন কুপার।
তাঁর মতে, এর পরই পাকিস্তানের পাল্টা অভিযান বুনিয়ান-উন-মারসুস (Operation Bunyan-un-Marsoos) ব্যর্থ হয়। ভারতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সব হামলা প্রতিহত হয়। “সেই সময় পাকিস্তান শেষ হয়ে গিয়েছিল,” কুপারের মন্তব্য। তিনি বলেন, এই হামলাই তাঁকে নিশ্চিত করেছে যে পুরো সংঘাতে ভারতের স্পষ্ট জয় হয়েছে। “এমন জায়গায় আঘাত করা মানে নিশ্চিত জানা—প্রতিপক্ষ আর পাল্টা আঘাত করতে পারবে না।” কুপার আরও দাবি করেন, পাকিস্তানের ভেতরের কিছু ‘ব্যক্তিগত সূত্র’ থেকেও তিনি এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।
কিরানা হিলস যে পারমাণবিক ঘাঁটি, তা নিয়ে কুপারের সন্দেহ নেই। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের একদল পরমাণু বিজ্ঞানীর বুলেটিনেও এই জায়গাকে পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারতের বিশ্লেষকরাও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। “যখন আপনি দেখেন ৪০টি শক্তপোক্ত আশ্রয়কেন্দ্র, দু’টি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, ৫০টির বেশি ভূগর্ভস্থ প্রবেশপথ—তখন বোঝাই যায় এটা কী ধরনের জায়গা। সেখানে রিঅ্যাক্টর নাও থাকতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে পারমাণবিক অস্ত্র নেই,” বলেন তিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি সারগোধা (Sargodha) কিরানা হিলসের খুব কাছেই। সেখানে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। “তাহলে কাছাকাছি কোনও সংরক্ষণাগার না থাকলে এই প্রশিক্ষণের মানে কী?” প্রশ্ন তাঁর।
এমন হামলার পর উত্তেজনা কি আরও বাড়তে পারত? কুপারের মতে, প্রেক্ষাপট না বুঝলে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। তাঁর দাবি, পাকিস্তান যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল, প্রায় সবই ভারত ভূপাতিত করে। পাকিস্তানের একাধিক যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়, পাইলট নিহত হন। “তারপর ভারত পাল্টা হামলা চালিয়ে ১২-১৩টি পাকিস্তানি বিমানঘাঁটিতে আঘাত করে। আর শেষে আসে কিরানা হিলসের ওপর হামলা। এর পর বার্তাটা পরিষ্কার—তোমরা কিছুই করতে পারবে না,” বলেন তিনি। এই অবস্থাতেই পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানায় এবং ভারত সম্মত হয়।
কুপারের মতে, এই হামলার জন্য আলাদা কোনও বিশেষ বিমান বা অস্ত্রের প্রয়োজন হয়নি। “সু-৩০ থেকে ব্রহ্মোস (BrahMos) ও র্যাম্পেজ (Rampage), জাগুয়ার থেকে র্যাম্পেজ, রাফাল থেকে স্কাল্প (SCALP)—এই অস্ত্রই যথেষ্ট ছিল,” বলেন তিনি। তিনি ভারতীয় সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, এটি শুধু প্রতিরক্ষাই নয়, দ্রুত আক্রমণেও ভারতকে সক্ষম করেছে। “একই সঙ্গে এত বড় অভিযান সমন্বয় করা সহজ কাজ নয়। অনেক দেশ এমন ব্যবস্থা বানাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ভারতের ব্যবস্থা টিকে গেছে,” কুপারের মন্তব্য।
তিনি আরও বলেন, এমনকি চীনের জে-২০ (J-20) স্টেলথ বিমান এলেও ভারতের রাডার ব্যবস্থা সেগুলি শনাক্ত করতে পারবে। “ধরা পড়লে স্টেলথ আর স্টেলথ থাকে না।” সবশেষে কুপার বিস্ময় প্রকাশ করেন কেন ভারতীয় বায়ুসেনা এখনও এই হামলার কথা অস্বীকার করছে। তাঁর কথায়, “এটা যেন বলা হচ্ছে সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে না। এতে কার লাভ হচ্ছে, আমি বুঝি না।”