বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫,৭০০ কেজির কম ওজনের বিমানের ক্ষেত্রে কিছু অপারেটর স্বেচ্ছায় ব্ল্যাক বক্স বসালেও এই বিমানটি পুরনো মডেলের হওয়ায় তৎকালীন নিয়ম তুলনামূলক শিথিল ছিল।

শেষ আপডেট: 25 February 2026 14:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঝাড়খণ্ডে ভয়াবহ এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স দুর্ঘটনার (Jharkhand air ambulance crash) তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সোমবার রাতে যে 'মেডিক্যাল ইভাকুয়েশন' বিমানটি ভেঙে পড়ে সাত জনের মৃত্যু হয়, সেই বিমানে কোনও ব্ল্যাক বক্সই ছিল না (no black box Jharkhand air ambulance crash) - জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা তদন্তকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অসামরিক বিমান চলাচলের নিয়ম অনুযায়ী, ৫,৭০০ কেজির কম ওজনের বিমানে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (CVR) বা ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (FDR) বাধ্যতামূলক নয়। ফলে দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে তদন্তকারীদের ভরসা রাখতে হবে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগের নথি, ধ্বংসাবশেষের বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের উপর (Jharkhand air ambulance crash investigation)।
আবহাওয়া রাডার নিয়েও সন্দেহ (weather radar aircraft failure doubt)
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক - বিমানের অনবোর্ড আবহাওয়া রাডার ঠিকমতো কাজ করছিল কি? প্রশ্ন উঠছে সেই নিয়েও। প্রাথমিকভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, রাডারের ত্রুটির কারণেই কি বিচক্র্যাফট সি৯০ কিং এয়ার (Beechcraft C90 King Air) পরিকল্পিত রুট থেকে সরে গিয়ে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল।
জানা গেছে, একই রুটে আগে চলা দুটি বাণিজ্যিক বিমান, এয়ার ইন্ডিয়া (Air India) এবং ইন্ডিগো (IndiGo) - খারাপ আবহাওয়ার মুখে পড়ে রুট পরিবর্তনের অনুমতি চেয়েছিল। ইন্ডিগোর বিমান বাম দিকে সরে যাওয়ার অনুমতি নেয়, আর দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমান ডান দিকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করে।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, আবহাওয়া রাডার ঠিকমতো কাজ করছিল কি না, নাকি পাইলটরা রাডারের তথ্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। যন্ত্রের ত্রুটি ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিমান ও যাত্রীদের তথ্য
বিমানটি পরিচালনা করছিল রেডবার্ড এয়ারওয়েজ প্রাইভেট লিমিটেড (Redbird Airways Pvt Ltd)। রাঁচি থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে চাত্রা জেলার কাসারিয়া এলাকায় ভেঙে পড়ে বিমানটি। বিমানে ছিলেন ৪১ বছরের রোগী সঞ্জয় কুমার, এক চিকিৎসক, এক প্যারামেডিক, দু’জন সহকারী এবং দু’জন পাইলট - মোট সাত জন।
পাইলট ইন কমান্ড বিবেক বিকাশ ভগতের উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় ১,৪০০ ঘণ্টা। ফার্স্ট অফিসার সব্রদীপ সিংয়ের উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় ৪৫০ ঘণ্টা।
জানা গিয়েছে, বিমানটি তৈরি হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। ২০২২ সালে এটি কিনেছিল রেডবার্ড এয়ারওয়েজ, এর আগে ২০০১ সালে ওরিয়েন্ট ফ্লাইং স্কুল এটি অধিগ্রহণ করেছিল। আরও খবর, ২০১৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বিমানটি ব্যবহার করা হয়নি - যদিও এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ওই সময়ে ফ্লাইং স্কুলের কাছে এটি আয়বিহীন সম্পদ হিসেবে বিবেচিত ছিল।
তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি
সম্প্রতি বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা (Directorate General of Civil Aviation) চার্টার্ড জেট সংস্থাগুলির উপর বিশেষ অডিটের নির্দেশ দিয়েছিল। গত মাসে বারামতিতে একটি লিয়ারজেট দুর্ঘটনায় মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রীকে বহনকারী বিমান ভেঙে পড়ে সকলের মৃত্যু হওয়ার পরই এই নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে রেডবার্ড এয়ারওয়েজের অডিট হয়েছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
দুর্ঘটনাস্থলে তদন্তে নেমেছে বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা (Aircraft Accident Investigation Bureau)-এর একটি দল। অসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী রাম কোহন নাইডু শোক প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই প্রাণহানিতে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত এবং স্থানীয় প্রশাসন ও তদন্তকারী দল দ্রুত উদ্ধার ও তদন্তের কাজ শুরু করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫,৭০০ কেজির কম ওজনের বিমানের ক্ষেত্রে কিছু অপারেটর স্বেচ্ছায় ব্ল্যাক বক্স বসালেও এই বিমানটি পুরনো মডেলের হওয়ায় তৎকালীন নিয়ম (aviation safety India) তুলনামূলক শিথিল ছিল।
তদন্তে এখন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে। বিমানটি মেঘের মধ্যে ঢুকে যাওয়ায় নাক নিচের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল কি না, আগুন লেগেছিল কি না, অথবা প্রবল ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী বায়ুপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়াগত পরিস্থিতি প্রভাব ফেলেছিল কি না - এসবই খতিয়ে দেখা হবে।
উড়ানের পথ ও শেষ যোগাযোগ
ডিজিসিএ সূত্রে জানা গেছে, বিমানটি সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিটে রাঁচি থেকে উড়েছিল এবং রাত ১০টার মধ্যে দিল্লিতে পৌঁছনোর কথা ছিল। রাঁচি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল কিছুক্ষণ পরই বিমানটিকে কলকাতা এরিয়া কন্ট্রোলের হাতে তুলে দেয়।
বিমানটির আটালি (ATALI) ওয়েপয়েন্ট পার হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত রুট থেকে সরে যায়। সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটে শেষবার রাডারে ধরা পড়ে বিমানটি - তখন সেটি ১৩,৮০০ ফুট উচ্চতায় এবং রাঁচি থেকে প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল।
শেষবার রেডিও যোগাযোগ হয় সন্ধ্যা ৭টা ৩৪ মিনিটে কলকাতার নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে। এরপর বারাণসীর দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ১০০ নটিক্যাল মাইল দূরে যোগাযোগ ও রাডার, দুটোই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিমানটি বারাণসী বা লখনউ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি। এরপরই কলকাতার রেসকিউ কোঅর্ডিনেশন সেন্টার অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শুরু করে।