বিহারের রাজনীতিতে কি বড় পরিবর্তন আসছে? নীতীশ কুমার রাজ্যসভায় গেলে কি প্রথমবার নিজের মুখ্যমন্ত্রী পাবে বিজেপি?

নীতীশ কুমার
শেষ আপডেট: 5 March 2026 09:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিহারের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত। জোর জল্পনা—বড় খবর হল, মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার (Nitish Kumar) রাজ্যসভায় যেতে পারেন। আর তাতে খুলে যেতে পারে বিহারে প্রথমবারের মতো বিজেপির নিজস্ব মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথ।
রাজনৈতিক সূত্রে খবর, বিজেপি এখন আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়। জোট রাজনীতির বহু বছরের সমীকরণ বদলে গেছে। সংখ্যার অঙ্ক, নেতৃত্বের প্রশ্ন, বয়স ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে বিজেপি এখন বিহারের ক্ষমতার কেন্দ্রে বসাতে চাইছে এক্কেবারে নিজেদের কাউকে। খাঁটি বিজেপি মুখ।
এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় রাজনৈতিক কারণ:
১. সংখ্যার অঙ্ক বদলে দিয়েছে জোটের শক্তির ভারসাম্য
বিহার বিধানসভায় বর্তমানে বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা ৮৯, আর নীতীশ কুমারের দল জেডিইউ-এর বিধায়ক ৮৫। বছরের পর বছর ধরে জোট রাজনীতিতে নীতীশ কুমার ছিলেন ‘বড় ভাই’। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যায় এগিয়ে থেকেও মুখ্যমন্ত্রী পদ ছেড়ে দিয়েছিল শুধুমাত্র জোট বজায় রাখার জন্য। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি জেডিইউ-এর চেয়ে একটি বেশি আসনে লড়েছিল। সেটাকেই অনেকেই মনে করেছিলেন জোটের শক্তির ভারসাম্য বদলের প্রতীক।
বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতার কথায়— “সংখ্যার বিচারে এখন বিজেপিই বড় দল। তাই নেতৃত্বেও পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক।”
২. বিহার এখনও বিজেপির ‘অসম্পূর্ণ অধ্যায়’
হিন্দি বলয়ের রাজনীতিতে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগড়—সব জায়গাতেই বিজেপির নিজস্ব মুখ্যমন্ত্রী রয়েছে। কিন্তু বিহার এখনও ব্যতিক্রম। ১৯৯০-এর দশক থেকে বিহারের রাজনীতি মূলত লালু প্রসাদ যাদব এবং পরে নীতীশ কুমারকে কেন্দ্র করেই ঘুরেছে। বিজেপি কখনও এককভাবে রাজ্যের নেতৃত্বে আসেনি। তাই দলের ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছে, এখন সেই সময় এসেছে।
৩. বয়স ও স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
নীতীশ কুমারের বয়স এখন ৭৫ বছর। গত কয়েক বছরে তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা হয়েছে। সূত্রের দাবি, জেডিইউ নেতৃত্ব নাকি অনেক সময়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগও সীমিত রেখেছিল। তিনি খুব কম জনসমক্ষে আসতেন বা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতেন।
বিজেপির এক নেতা বলেন—“নীতীশজি দীর্ঘদিন রাজ্যকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এখন নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার সময়।” এই যুক্তিও বিজেপির নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিকে জোরালো করছে।
৪. ‘সম্মানজনক বিদায়’-এর রাজনৈতিক কৌশল
বস্তুত বিজেপিও এই বার্তা দিতে চাইছে না যে নীতীশ কুমারকে সরাসরি সরানো হল। বরং রাজ্যসভায় পাঠিয়ে সম্মানজনক বিদায় দেওয়া হচ্ছে এই বার্তাই দিতে চান অমিত শাহরা। রাজনীতিতে এটিকে বলা হয় গ্রেসফুল এক্সিট। নীতীশের মতো দীর্ঘদিনের নেতা যাতে সম্মান বজায় রেখে সক্রিয় রাজনীতির অন্য ভূমিকায় যেতে পারেন, সেই পথ খোলা রাখতে চাইছে বিজেপি।
রাজনৈতিক সূত্রের মতে, এই কারণেই রাজ্যসভা মনোনয়ন নিয়ে বাজার এত গরম।
৫. জেডিইউ-এর ভিতরেও উত্তরাধিকার প্রশ্ন
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—নীতীশ কুমারের ছেলে নিশান্ত কুমার রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারেন। জেডিইউ-এর একাধিক নেতা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে বলেছেন যে নিশান্তকে সক্রিয় রাজনীতিতে দেখা যেতে পারে। জল্পনা রয়েছে—তিনি ভবিষ্যতে উপমুখ্যমন্ত্রীও হতে পারেন। যদিও এই বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়, তবু এটি বিহারের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
৬. জোটের ভিতরে প্রশাসনিক অসন্তোষ
সাম্প্রতিক সময়ে এনডিএ জোটের কয়েকজন নেতা বিহারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে মদ নিষিদ্ধকরণ নীতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন—জিতন রাম মাজি ও চিরাগ পাসওয়ান। এই ধরনের মতভেদও বিজেপিকে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
৭. নীতীশের নীরবতা বাড়াচ্ছে রহস্য
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—নীতীশ কুমার এখনও পর্যন্ত এই জল্পনা নিয়ে কিছুই বলেননি। বিহারের রাজনীতিতে তিনি বহুবার সমীকরণ বদলেছেন। এই কারণেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে প্রায়ই বলেন— “পল্টু রাম”। তাই শেষ মুহূর্তে আবার নতুন সমীকরণ তৈরি হবে কি না, সেই প্রশ্নও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নীতীশ কুমার বিহারের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তিনি ১০ বার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা তাঁকে বিহারের রাজনীতির এক অনন্য চরিত্রে পরিণত করেছে।
চুম্বকে এখন প্রশ্ন একটাই— নীতীশ যুগের অবসান কি সত্যিই দরজায় কড়া নাড়ছে, নাকি আবারও নিজের রাজনৈতিক দক্ষতায় সমীকরণ বদলে দেবেন তিনি?