রাজ্যসভায় যেতে পারেন নীতীশ কুমার। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী পদে বিজেপির সম্ভাব্য মুখ কারা? সম্রাট চৌধুরী, বিজয় সিনহা সহ একাধিক নাম ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে।

নীতীশ কুমার ও নরেন্দ্র মোদী
শেষ আপডেট: 5 March 2026 08:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সবকিছু ঠিক থাকলে আজকালের মধ্যেই রাজ্যসভার নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র পেশ করতে পারেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার (Nitish Kumar)। তার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগ পত্র পেশ করবেন।
প্রশ্ন হল নীতিশের ছেড়ে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে এরপর কে বসবেন? বিহারের রাজনৈতিক মহলের খবর নীতীশের দল জনতা দল ইউনাইটেডের কোনও নেতার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। এবার নীতীশ কুমার তাঁর দীর্ঘদিনের শরিক বিজেপিকেই রাজ্য শাসনের ভার তুলে দিতে পারেন।
বিজেপির সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দলের আলোচনায় নাম আছে দুই উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এবং বিজয় সিনহার। এছাড়া শিল্পমন্ত্রী দিলীপ জয়সওয়াল এবং বিধায়ক সঞ্জীব চৌরাশিয়ার নামও আলোচনায় আছে।

মানুষটি নীতীশ কুমার হওয়ায় বুধবার গভীর রাতেও উপমুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা সম্রাট চৌধুরী দায়িত্ব নিয়ে বলতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তন হচ্ছেই। তিনি বলেন এটা সম্পূর্ণ নীতীশজির বিষয়। তবে আলোচনা হয়েছে তিনি রাজ্যসভায় চলে যাবেন। বিজেপি সূত্রের খবর, গোটা বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বৃহস্পতিবার পাটনায় যাচ্ছেন।
বিহারের রাজনৈতিক মহলের খবর নীতীশ রাজ্যসভায় গেলে নতুন মন্ত্রিসভায় উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখা যাবে তাঁর পুত্রকে। যারৈ সঙ্গে রাজনীতির বিন্দু বিসর্গ যোগ নেই। এতদিন পুত্রকে রাজনীতিতে না আনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একাধিকবার নীতিশের নাম করে বলেছেন, ভারতের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে উজ্জ্বল নিদর্শন হলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে নীতীশও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে দলের কোন নেতাকে নয়, নিজের পুত্রকে বেছেছেন।
ভারতে জোট সরকারের ইতিহাসে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের পরেই বিহারের নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে বিজেপি
ও জেডিইউ সরকারের নাম আসে। বিজেপির সঙ্গে বিহারের সমাজবাদী নেতা নীতীশের যোগাযোগ নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ওই সময় লালু প্রসাদের মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে নীতীশ কুমার প্রথমে সমতা পার্টি তৈরি করেন। ১৯৯৬ এ অটলবিহারী বাজপেয়ীর ১৩ দিনের মন্ত্রিসভার অন্যতম সমর্থক দল ছিল সমতা পার্টি। বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে নীতীশের নতুন দল সুবিধা করতে না পারলেও লোকসভায় তারা বেশ কয়েকটি আসন পেয়েছিল।
১৯৯৯-এ লোকসভার অন্তর্বর্তী নির্বাচনের পর অটল বিহারী বাজপেয়ি পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসীন হন। তখন থেকে বিহারে বিজেপি এবং জেডিইউ-র বোঝাপড়াও মজবুত হতে থাকে। সেই নির্বাচনে রাজ্যে লালু প্রসাদের রাষ্ট্রীয় জনতা দলকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে ভাল ফল করেছিল জেডিইউ-বিজেপির জোট।
সেই বোঝাপড়ার সূত্রে নীতীশ কুমার কুমার ২০০০ সালে বিজেপির সমর্থনে প্রথমবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে সাত দিনের মাথায় তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়। ফের মুখ্যমন্ত্রী হন আরজেডিনেত্রী রাবড়ি দেবী। নীতীশ চলে যান দিল্লিতে অটল বিহারী বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভার কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে।
তবে তাঁর চোখ পড়েছিল বিহারের দিকে। বাজপেয়ীও এই ব্যাপারে নীতীশের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সহযোগিতা করে গিয়েছেন। জেডিইউ নেতা একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাজপেয়ী তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দিয়ে গিয়েছেন। সেই কারণে বরাবর বিহারের তো বটেই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারাও নীতীশ কুমারকে যথেষ্ট সমঝে চলতেন। সেই সমীকরণ বজায় রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও।
২০০৫ এ বিহারে পাকাপাকিভাবে মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ। তারপর একাধিকবার তিনি কখনও বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। কখনও নতুন করে বন্ধুত্ব করেছেন গেরুয়াবাদীদের সঙ্গে। তাৎপর্যপূর্ণ হল ২০০৫ থেকে বিগত দু দর্শকে নীতীশ চারবার বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করলেও গেরুয়া শিবির তারু জন্য দরজা কখনই বন্ধ করেনি। শেষবার তিনি বিজেপিকে ছেড়ে ফের লালু প্রসাদের আরজেডির হাত ধরলে অমিত শাহ সহ পদ্ম শিবিরের বহু নেতা গালমন্দ করলেও একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বরং তারপরও তিনি নানা অবকাশে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীকে একজন স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবেই বর্ণনা করেছেন।
যদিও নীতিশের প্রথম বিজেপির সঙ্গ ত্যাগের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নরেন্দ্র মোদীর নাম। ২০১৩ সালে বিজেপি মোদীকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ঘোষণা করলে নীতীশ কুমার এনডিএ ত্যাগ করেন। সেবারই প্রথম বিজেপির সঙ্গে তারু বড় ধরনের গোলমাল বেঁধেছিল। জেডিইউ নেতার বক্তব্য ছিল, গুজরাত দাঙ্গায় অভিযুক্ত মোদীকে তিনি এনডিএ-র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে মেনে নেবেন না।
কিন্তু লোকসভা নির্বাচনে বিহারে মোদী হাওয়ায় নীতীশ ও লালু প্রসাদের দল জোর ধাক্কা খেলে রাজনীতির সমীকরণ ফের বদলাতে শুরু করে। ২০১৫ তে বিধানসভা নির্বাচনে লালু প্রসাদ ও নীতীশ কুমার জোট করে বিজেপিকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দিলেও দু'দলের সম্পর্ক টেকেনি। দু বছরের মাথায় নীতীশ ফের বিজেপির হাত ধরেন। এইভাবে মোট চারবার দলবদল করে বিহারের রাজনীতিতে পাল্টুরাম আখ্যা পেয়েছেন নীতীশ কুমার।
কিন্তু লক্ষণীয় হল, রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি শরিকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও বিহারে তাদের কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নীতীশ কুমার বারে বারে বিজেপিকে অপদস্থ করলেও নরেন্দ্র মোদী কখনই দলকে নীতীশের বিরোধিতায় বেশিদূর এগোতে দেননি। তিনি অপেক্ষা করেছেন।
গত বছর অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের আগেই প্রচার শুরু হয়েছিল নীতীশ আর মুখ্যমন্ত্রী হবেন না। তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে এতটাই দুর্বল যে নিয়মিত সচিবালায় যান না। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কমিয়ে দিয়েছেন। যদিও তিনিই পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি। কিন্তু ভোটের পর দেখা গেল সেই নীতীশ কুমারই ফের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন, যিনি চারপাশের ঘনিষ্ঠ অফিসার, দলের নেতা প্রমুখের নাম মনে রাখতে পারেন না। কথা জড়িয়ে যায়। তাঁর আচরণের মধ্যেও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে।
এ নিয়ে বিরোধীরা চিৎকার চেঁচামেচি করলেও বাস্তব হল বিগত বিধানসভা নির্বাচনে নীতীশ দলকে আরও বেশি আসনে জিতিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন। তাঁর ফের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার বাসনায় তাই বাদ সাধেনি পদ্ম শিবির। তারা ফের অপেক্ষার কৌশল নেয়। অবশেষে তাদের সেই স্বপ্ন সফল হতে চলেছে বলেই বিহারের একাধিক রাজনৈতিক সূত্রের খবর। তা হল, ঝগড়া, বিবাদ নয় আপস আলোচনায় ক্ষমতা হস্তান্তর।
রাজনৈতিক মহল মনে করছে ক্ষমতা দখলে বিজেপির বিহার মডেল এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত। নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর একাধিক রাজ্য বিজেপি দখল করেছে বিধায়ক ভাঙিয়ে। এই ব্যাপারে সব ধরনের নাটকীয়তাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল ২০২৩-এ মহারাষ্ট্রে শিবসেনা নেতা একনাথ শিন্ডেকে মুখ্যমন্ত্রী করে রাজ্য রাজনীতিতে বাল ঠাকরে পরিবারকে বড় ধাক্কা দেয় পদ্ম শিবির। কিন্তু গতবছর মহারাষ্ট্রে বিধানসভা নির্বাচনের পর শিন্ডেকে আর মুখ্যমন্ত্রী করেনি বিজেপি।
কিন্তু বিহারে বিগত ১৫ বছর ধরে জেডিইউ-র তুলনায় বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা অনেক বেশি হলেও নীতিশ কুমারকেই মুখ্যমন্ত্রী বেছে নিয়েছেন পদ্ম শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব। বিজেপির অন্দরমহলের খবর এই ব্যাপারে দলের অবস্থান যেমন স্পষ্ট তেমনই আরএসএস নেতৃত্ব চায়নি নীতীশের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করা হোক।
আসলে বিজেপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের শরিকদের সঙ্গে যথাসম্ভব সৌজন্যের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার একটা অলিখিত সিদ্ধান্ত পদ্ম শিবিরে এবং আরএসএসের মধ্যে আছে। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা নানা সময়ে বিজেপি সঙ্গে হাত মেলালেও তারা কখনই ঘনিষ্ঠ হতে চায়নি। অন্যদিকে, নীতীশ কুমার হিন্দুত্বের রাজনীতিতে গা না ভাসিয়েও বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক মোটের ওপর টিকিয়ে রেখেছেন। বিজেপি-জেডিইউ কেউই কারও জন্য দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। এখন দেখার নীতীশ সত্যিই মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি ছেড়ে রাজ্যসভায় যান কিনা।