উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিভিত্তিক বৈষম্য রোধে সম্প্রতি ঘোষিত ইউজিসির নতুন নির্দেশিকা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

ইউজিসির নতুন ‘ইক্যুইটি রেগুলেশন’ এখন জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
শেষ আপডেট: 27 January 2026 18:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিভিত্তিক বৈষম্য রোধে সম্প্রতি ঘোষিত ইউজিসির নতুন নির্দেশিকা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ বা তথাকথিত ‘উচ্চবর্ণ’ শ্রেণির বিভিন্ন গোষ্ঠী এই নিয়মকে একতরফা ও ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি করছে। ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে এই বিধির বিরুদ্ধে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, এমনকী একজন প্রশাসনিক আধিকারিকের পদত্যাগ— সব মিলিয়ে ইউজিসির নতুন ‘ইক্যুইটি রেগুলেশন’ এখন জাতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে।
ইউজিসি ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে ‘ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন (প্রোমোশন অব ইক্যুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশনস) রেগুলেশনস, ২০২৬’। এর মাধ্যমে ২০১২ সালের জাতিভিত্তিক বৈষম্য বিরোধী নিয়ম সংশোধন করা হয়। নতুন নিয়মে ‘কাস্ট-বেসড ডিসক্রিমিনেশন’ বা জাতিভিত্তিক বৈষম্যকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এমন বৈষম্য হিসেবে, যা শুধুমাত্র তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি উপজাতি (এসটি) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) সদস্যদের বিরুদ্ধে করা হয়। অর্থাৎ সংজ্ঞার মধ্যেই সাধারণ শ্রেণির ছাত্রছাত্রী বা শিক্ষকরা কার্যত বাদ পড়ছেন।
এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈষম্য রোধে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে হেল্পলাইন চালু করা, মনিটরিং ব্যবস্থা গঠন, নিয়মিত রিপোর্ট ইউজিসির কাছে পাঠানো ইত্যাদি। এই ব্যবস্থার দায়িত্ব সরাসরি প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের উপর চাপানো হয়েছে। উপাচার্য, অধ্যক্ষদের ব্যক্তিগতভাবে নিয়ম মানার নিশ্চয়তা দিতে হবে। যদি কোনও প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশিকা না মানে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। যেমন, নতুন কোর্স অনুমোদন বন্ধ করা, ইউজিসির বিভিন্ন প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া বা এমনকী প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি প্রত্যাহার পর্যন্ত করা হতে পারে।
এই নতুন নিয়ম এসেছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর। ২০১২ সালের ইউজিসি অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন রেগুলেশন কার্যকরভাবে রূপায়ণ হচ্ছে না— এই অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন রাধিকা ভেমুলা এবং আবেদা সালিম তাদভি।রাধিকা ভেমুলা হলেন হায়দরাবাদ সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির গবেষক রোহিত ভেমুলার মা। আর আবেদা তাদভি হলেন মুম্বইয়ের চিকিৎসক পড়ুয়া পায়েল তাদভির মা। রোহিত ও পায়েল দু’জনেই জাতিভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ইউজিসিকে নতুন, শক্তিশালী নিয়ম তৈরির নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশ মেনেই ইউজিসি ২০২৬ সালের নতুন ইক্যুইটি রেগুলেশন জারি করে।
নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে মূল আপত্তি এসেছে সংজ্ঞা নিয়েই। সমালোচকদের বক্তব্য, ইউজিসি যেভাবে ‘কাস্ট-বেসড ডিসক্রিমিনেশন’ সংজ্ঞায়িত করেছে, তাতে সাধারণ শ্রেণির ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা পুরোপুরি সুরক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, বৈষম্য যে কোনও দিক থেকেই হতে পারে। কিন্তু নতুন নিয়মে শুধু সংরক্ষিত শ্রেণির মানুষদেরই ‘ভিকটিম’ হিসেবে ধরা হচ্ছে। ফলে সাধারণ শ্রেণির কেউ যদি বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তাঁদের জন্য কোনও কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তির পথ থাকছে না। আরও অভিযোগ, এই নিয়মে ‘ভুল অভিযোগ’ বা মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে কোনও সুরক্ষা নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শুরু থেকেই অপরাধী ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হবে, যা ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করবে।
রাজ্যসভা সাংসদ প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন, এই আইন কি সকলের জন্য সমান সুরক্ষা দিচ্ছে? তাঁর কথায়, সমতা মানে কি শুধু এক শ্রেণির মানুষকে রক্ষা করা? মিথ্যা অভিযোগ হলে তার বিচার কীভাবে হবে? বৈষম্যের সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারিত হবে— কথা, আচরণ না কি ব্যক্তিগত অনুভূতির ভিত্তিতে? উত্তরপ্রদেশের বিজেপি এমএলসি দেবেন্দ্রপ্রতাপ সিং ইউজিসিকে চিঠি লিখে বলেন, দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণির সুরক্ষা অবশ্যই দরকার, কিন্তু তার জন্য সাধারণ শ্রেণির ছাত্রদের নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া ঠিক নয়। তাঁর মতে, এই নিয়ম সমাজে জাতিগত বিভাজন আরও গভীর করবে।
এই বিতর্ক আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে। আইনজীবী বিনীত জিন্দাল সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করে দাবি করেছেন, ইউজিসির রেগুলেশন ৩(সি) অসাংবিধানিক ও বর্জনমূলক। এতে এসসি, এসটি ও ওবিসি ছাড়া অন্যদের কোনও সুরক্ষা নেই। তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেছেন, জাতিভিত্তিক বৈষম্যের সংজ্ঞা যেন জাতি-নিরপেক্ষ ও সংবিধানসম্মতভাবে নির্ধারণ করা হয়। আরেকটি মামলা করেছেন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মৃত্যুঞ্জয় তিওয়ারি।
নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ করেছেন। জয়পুরে করণী সেনা, ব্রাহ্মণ মহাসভা, কায়স্থ মহাসভা, বৈশ্য সংগঠনগুলির মতো গোষ্ঠীগুলি একত্র হয়ে ‘সাবর্ণ সমাজ কো-অর্ডিনেশন কমিটি’ গঠন করে আন্দোলনে নেমেছে। দিল্লিতে ইউজিসি সদর দফতরের সামনে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছেন সাধারণ শ্রেণির একাংশ পড়ুয়া। তাঁদের স্লোগান, ‘নো টু ইউজিসি ডিসক্রিমিনেশন’।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক অলোকিত ত্রিপাঠী সংবাদসংস্থাকে বলেন, এই নিয়ম কলেজে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। তাঁর অভিযোগ, প্রমাণের দায় পুরোপুরি অভিযুক্তের উপর চাপানো হবে। ইক্যুইটি স্কোয়াডের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে নজরদারি বাড়বে, যা একপ্রকার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের মতো।
বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন উত্তরপ্রদেশের বরেলির সিটি ম্যাজিস্ট্রেট অলঙ্ক অগ্নিহোত্রী পদত্যাগ করেন। ২০১৯ ব্যাচের এই প্রাদেশিক প্রশাসনিক আধিকারিক নতুন ইউজিসি নিয়মকে ‘ব্ল্যাক ল’ বা কালো আইন বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এই নিয়ম ক্যাম্পাসে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দিতে পারে এবং অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করা উচিত।
ক্রমবর্ধমান বিতর্কের মুখে এবার হস্তক্ষেপ করতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি সূত্রে খবর, ইউজিসি নিয়ম নিয়ে যে ‘ভ্রান্ত তথ্য’ ছড়ানো হচ্ছে, তার জবাবে সরকার বাস্তব তথ্য তুলে ধরবে। সরকার আশ্বাস দিয়েছে, এই নিয়মের অপব্যবহার কোনও অবস্থাতেই হতে দেওয়া হবে না। বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, নতুন নিয়ম নিয়ে সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি শীঘ্রই দূর করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মোদি সরকারই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সাধারণ শ্রেণির জন্য ১০ শতাংশ ইডব্লুএস সংরক্ষণ চালু করেছে। তাঁর বক্তব্য, যতদিন নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, ততদিন উচ্চবর্ণের সন্তানদের কোনও ক্ষতি হবে না।
ইউজিসির নতুন ইক্যুইটি রেগুলেশন একদিকে দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণির সুরক্ষা জোরদার করার উদ্দেশ্যে আনা হলেও, অন্যদিকে তা নতুন করে জাতিগত বিভাজনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সমতার নামে আইন কি এক শ্রেণিকে বেশি সুরক্ষা দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করতে পারে— এই মৌলিক প্রশ্নই এখন জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে। সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং কেন্দ্রের অবস্থানের দিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশ। এই নিয়ম সত্যিই ক্যাম্পাসে ন্যায্যতা ও নিরাপত্তা আনবে, নাকি আরও গভীর করবে অবিশ্বাস ও বিভাজন— তার উত্তর এখনও ভবিষ্যতের আঁচলে।