এই চুক্তির ফলে আগামী এক দশকে ভারতের আমদানি বাজারে বড়সড় পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। বিশেষ করে ইউরোপ থেকে আসা গাড়ি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ওষুধ, বিমান ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কমার ফলে সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বাজারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবি, এই চুক্তির ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে তাদের রফতানি প্রায় দ্বিগুণ হবে এবং বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে।
শেষ আপডেট: 27 January 2026 14:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সদ্য চূড়ান্ত হওয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রথম বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ হল। সেই অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে আগামী এক দশকে ভারতের আমদানি বাজারে বড়সড় পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। বিশেষ করে ইউরোপ থেকে আসা গাড়ি, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ওষুধ, বিমান ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কমার ফলে সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের বাজারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দাবি, এই চুক্তির ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে তাদের রফতানি প্রায় দ্বিগুণ হবে এবং বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মঙ্গলবার জানিয়ে দিলেন, ২৭টি দেশের সংযুক্ত সংগঠন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। একইসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেন, ভারত এবং ইইউ ভরসাজনক বন্ধুত্বের রাস্তায় পা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতের নেতৃত্বকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য সকলের প্রশংসা করেন তিনি।
গাড়ি শিল্প খাতে এই চুক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ইউরোপ থেকে আমদানি করা প্রিমিয়াম গাড়ির উপর ভারতের কার্যকর শুল্ক প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, ধাপে ধাপে এই শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো হবে। তবে বছরে সর্বোচ্চ ২ লক্ষ ৫০ হাজার গাড়ির একটি কোটা কার্যকর থাকবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভারতের প্রিমিয়াম কার বাজারকে নতুন করে সাজিয়ে দেবে এবং ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলির জন্য বাজার আরও সহজলভ্য হবে।
এই চুক্তির আওতায় ভারতের বাজারে প্রবেশ করা ইউরোপীয় পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশের উপর শুল্ক কমানো বা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। যন্ত্রপাতি ক্ষেত্রে যেখানে এখন সর্বোচ্চ ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক রয়েছে, সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুল্ক প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। রাসায়নিক পণ্যের উপর বর্তমানে প্রায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসে, সেটিও প্রায় পুরোপুরি তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ওষুধের ক্ষেত্রে বর্তমানে গড়ে ১১ শতাংশ শুল্ক নেওয়া হয়, নতুন চুক্তিতে সেটিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বা উঠে যাবে।
বিমান ও মহাকাশ ক্ষেত্রেও বড়সড় পরিবর্তন আসছে। ইউরোপ থেকে আমদানি করা বিমান ও মহাকাশ সংক্রান্ত প্রায় সব ধরনের পণ্যের উপর শুল্ক প্রায় পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহণ শিল্পে খরচ কমবে এবং ভবিষ্যতে উড়ান পরিষেবা আরও সাশ্রয়ী হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একইভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিশেষ করে অপটিক্যাল, মেডিক্যাল ও সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতির প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যের উপর শুল্ক তুলে নেওয়া হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক পরিষেবার খরচে।
খাদ্য ও পানীয় খাতেও এই চুক্তি একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরোপ থেকে আমদানি করা ওয়াইনের উপর শুল্ক ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে নামবে, স্পিরিটসের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ এবং বিয়ারের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ শুল্ক ধার্য থাকবে। অলিভ অয়েল, মার্জারিন এবং অন্যান্য বনস্পতি তেলের উপর শুল্ক কমানো বা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে এই পণ্যগুলি ভারতের বাজারে তুলনামূলকভাবে সস্তা হতে পারে।
পণ্যের পাশাপাশি পরিষেবা খাতেও ইউরোপ বড়সড় সুবিধা পেয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক পরিষেবা ও সামুদ্রিক পরিবহণ পরিষেবায় ইউরোপীয় সংস্থাগুলিকে বিশেষ প্রবেশাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এতদিন ভারত এই খাতে তুলনামূলকভাবে সংরক্ষণশীল ছিল, ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একে একটি বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে।
পরিবেশ সংক্রান্ত দিকটিও এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আগামী দু’বছরে ভারতকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ইউরো আর্থিক সহায়তা দেবে, যার মূল লক্ষ্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়া।
সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তি ভারতের বাজারকে ইউরোপীয় রফতানিকারকদের জন্য এতটাই খুলে দিল যা আগে কখনও হয়নি। অন্যদিকে ভারতের জন্য এটি একদিকে যেমন উপভোক্তাদের জন্য সুখবর, তেমনই দেশীয় শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জও বটে। বিশেষ করে অটো, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক এবং মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি নির্মাণ শিল্পে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। এগুলিতে ভারতীয় সংস্থাগুলিকে এখনই নিজেদের প্রযুক্তি, মান ও উৎপাদন খরচের দিকে নতুন করে নজর দিতে হবে।
ওয়াইন
স্পিরিটস
বিয়ার
অলিভ অয়েল, মার্জারিন ও অন্যান্য ভেজিটেবল অয়েল
কিউয়ি ও নাশপাতি
ফলমূলের রস ও নন-অ্যালকোহলিক বিয়ার
প্রসেসড ফুড (রুটি, পেস্ট্রি, বিস্কুট, পাস্তা, চকলেট, পোষ্যদের খাবার)
ভেড়ার মাংস
সসেজ ও অন্যান্য মাংসজাত প্রস্তুত খাবার