গত বারো মাসে ভারত–আমেরিকা সম্পর্কে একাধিক চাপ দেখা যায়। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বেশিমাত্রার ছাড়ে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়ায় ভারত। জ্বালানি নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্থিতি বজায় রাখার যুক্তি দিয়ে নয়াদিল্লি এই আমদানির পক্ষে অবস্থান নেয়।

ছবি - এআই
শেষ আপডেট: 3 February 2026 11:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত–আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির (US India Trade Deal) ঘোষণার ঠিক আগেই ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের (Dolcy Rodriguez) সঙ্গে কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। সেই ফোনালাপই এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপড়েন, বিশেষ করে রাশিয়ান তেল (Russian Crude Oil) আমদানিকে কেন্দ্র করে শুল্ক চাপের প্রেক্ষাপটে এই ফোনালাপকে তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
গত বারো মাসে ভারত–আমেরিকা সম্পর্কে একাধিক চাপ দেখা যায়। ইউক্রেন যুদ্ধের (Russia Ukraine War) পর বেশিমাত্রার ছাড়ে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়ায় ভারত। জ্বালানি নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্থিতি বজায় রাখার যুক্তি দিয়ে নয়াদিল্লি এই আমদানির পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার এই বিষয়টিকে বাণিজ্য আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
তাঁর দাবি ছিল, ভারত যদি রুশ তেল কেনা কমায়, তবে শুল্কে (US Tariff) ছাড় মিলতে পারে। একই সঙ্গে তিনি প্রস্তাব দেন, ভারত যেন আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে বেশি তেল কেনে।
মার্কিন শুল্ক চাপ
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে আমেরিকা ধাপে ধাপে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক বাড়ায়। শেষ পর্যন্ত মোট শুল্কের হার পৌঁছয় ৫০ শতাংশে, যার মধ্যে রুশ তেল কেনার কারণে আরোপিত ২৫ শতাংশ ‘দণ্ডমূলক’ শুল্কও ছিল। আলোচনা চললেও দীর্ঘদিন কোনও সমাধানসূত্র মেলেনি। ট্রাম্প প্রকাশ্যে এও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী মোদী নাকি রুশ তেল কেনা বন্ধ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যদিও সে সময় কোনও চুক্তি হয়নি।
ভেনেজুয়েলায় নজর
এই টানাপড়েনের মধ্যেই বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণার কয়েক দিন আগে মোদী ও ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজের মধ্যে ফোনালাপ হয়। শক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও কৃষি - একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়। রদ্রিগেজ দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়। দু’পক্ষই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে।
ভারত-আমেরিকা চুক্তি
এর পরেই মোদী–ট্রাম্প ফোনালাপের পর ভারত–আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতার ঘোষণা আসে। ট্রাম্প জানান, ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, ভারত রুশ তেলের বদলে আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানিতে সম্মত হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক আধিকারিক জানান, রুশ তেল বন্ধের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে।
যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রকাশ্যে শুল্ক কমার বিষয়টি স্বাগত জানালেও রুশ তেল বা বিকল্প উৎসের কথা সরাসরি উল্লেখ করেননি। তা সত্ত্বেও ট্রাম্পের ঘোষণায় ভেনেজুয়েলার নাম থাকায় আগের ফোনালাপের সময় নির্বাচন বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের গুণগত মান রুশ তেলের কাছাকাছি হওয়ায় কিছু ভারতীয় শোধনাগারে তা ব্যবহারযোগ্য। তবে সরবরাহ সীমাবদ্ধতা থাকায় পুরোপুরি বিকল্প হওয়া সহজ নয়।
এক বছরের অচলাবস্থার পর এই সমঝোতা ভারত–আমেরিকা সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করা হচ্ছে। শুল্ক, তেল আমদানি ও কূটনৈতিক তৎপরতার এই সমন্বয় দেখিয়ে দিল, জ্বালানি কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য সম্পর্কের বরফ গলানোর মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।