কেরলের এই সাফল্যের মূলভিত্তি তার বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসনিক কাঠামো। ১৯৯০-এর দশক থেকেই স্থানীয় পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলিকে পরিকল্পনা, তহবিল ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়। ফলে প্রশাসনিক জট কমে, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বেড়েছে।

সংগৃহীত ছবি
শেষ আপডেট: 1 November 2025 10:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের ইতিহাসে নতুন মাইলফলক ছুঁল কেরল (Kerala)। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন (Pinarayi Vijayan) শনিবার রাজ্য দিবসের (November 1) দিন ঘোষণা করলেন, কেরল এখন “চরম দারিদ্র্যমুক্ত রাজ্য”। এই ঘোষণার সঙ্গে কেরল হল ভারতের প্রথম রাজ্য এবং চিনের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় অঞ্চল, যেখানে ‘এক্সট্রিম পোভার্টি’ সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে।
তিরুবনন্তপুরমের (Thiruvananthapuram) সেন্ট্রাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী, স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিনিধি এবং সাংস্কৃতিক জগতের বিশিষ্টজনেরা। সেখানেই এই ঘোষণা করা হয়। রাজ্য গর্বের এই অর্জনকে ঘিরে আয়োজিত হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও।
‘চরম দারিদ্র্যমুক্ত’ মানে?
বিশ্বব্যাঙ্কের সংজ্ঞা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি বা পরিবার প্রতিদিন মাথাপিছু ২.১৫ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৮০ টাকা)–এরও কম আয়ে জীবনযাপন করে, তারা ‘চরম দারিদ্র্য’-র আওতায় পড়ে। ভারতে নীতি আয়োগের (NITI Aayog) Multidimensional Poverty Index (MPI) দারিদ্র্য পরিমাপে আরও বিস্তৃত কাঠামো দেয়, যেখানে আয় ছাড়াও বিবেচিত হয় পুষ্টি, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মৌলিক পরিষেবা প্রাপ্তি।
২০২৩ সালের নীতি আয়োগের এমপিআই রিপোর্ট অনুযায়ী, কেরলে মাত্র ০.৫৫ শতাংশ মানুষ ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র্য’-র আওতায়, যা দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর পরেই রয়েছে গোয়া (০.৮৪%) ও পুদুচেরি (০.৮৫%)।
কীভাবে সম্ভব হল এই সাফল্য
২০২১ সালে কেরল সরকার শুরু করে Extreme Poverty Eradication Project—পিনারাই বিজয়নের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ। উদ্দেশ্য ছিল সহজ—দারিদ্র্যপীড়িত প্রতিটি পরিবারকে স্থানীয় পর্যায়ে চিহ্নিত করে তাদের জন্য পৃথক সমাধান তৈরি করা।
কয়েক মাস ধরে কুডুম্বশ্রী (Kudumbashree), আশা (ASHA) কর্মী ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় রাজ্যজুড়ে চলে ঘরে ঘরে সমীক্ষা। তাতে চিহ্নিত হয় ৬৪,০০৬টি পরিবার, অর্থাৎ প্রায় ১.৩ লক্ষ মানুষ, যারা ‘চরম দারিদ্র্য’-তে বসবাস করছিলেন। তাদের প্রত্যেকের জন্য তৈরি হয় পৃথক হস্তক্ষেপমূলক কর্মসূচি—বাসস্থান, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার সমন্বয়ে।
কুডুম্বশ্রী আন্দোলন: পরিবর্তনের মূল স্তম্ভ
১৯৯৮ সালে নারীর স্বনির্ভরতা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয় কুডুম্বশ্রী। আজ এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মহিলা সমবায়—৪৫ লক্ষেরও বেশি নারী যুক্ত এই প্রকল্পে। এর বিকেন্দ্রীকৃত গঠন ও স্থানীয় সম্পৃক্ততাই কেরলের উন্নয়ন মডেলের মূল শক্তি।
বিকেন্দ্রীকৃত শাসনের সাফল্য
কেরলের এই সাফল্যের মূলভিত্তি তার বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসনিক কাঠামো। ১৯৯০-এর দশক থেকেই স্থানীয় পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলিকে পরিকল্পনা, তহবিল ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়। ফলে প্রশাসনিক জট কমে, স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বেড়েছে।
‘কেরল মডেল’ এখন উদাহরণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেরলের সাফল্যের গোপন সূত্র তার “inclusive governance”—যেখানে সরকারের পাশাপাশি নারীকেন্দ্রিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণ একসঙ্গে কাজ করে। ফল, লক্ষ্যভিত্তিক ও টেকসই দারিদ্র্য নির্মূল।
চিন ও কেরল—এই মুহূর্তে বিশ্বে মাত্র দুটি অঞ্চলই নিজেদের “চরম দারিদ্র্যমুক্ত” ঘোষণা করতে পেরেছে। ভারতের জন্য, এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক অর্জন।