রাজ্য জুড়ে জরিপ চালিয়ে ৬৪,০০৬টি পরিবারকে ‘অতিদরিদ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে মোট ১,০৩,০৯৯ জন নাগরিক এখন খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ পেয়েছেন।

কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন
শেষ আপডেট: 19 October 2025 15:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাত্র চার বছর আগে ২৪ বছরের রেম্যা পি-র জীবন যেন এক অন্ধকার গহ্বরে নেমে গিয়েছিল। স্বামী হারিয়েছেন, ক্যানসারে আক্রান্ত, দুই ছোট সন্তানের মা। অথচ মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, কাজ নেই, আয় নেই। কোল্লম জেলার চাভারা গ্রামের এই তরুণীর জীবন তখন শুধু সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার সমার্থক।
কিন্তু আজ সেই রেম্যা এক নতুন জীবনের প্রতীক। স্থানীয় পঞ্চায়েত কর্তারা তাঁকে খুঁজে পেয়েছিলেন রাজ্য সরকারের Extreme Poverty Eradication Project (EPEP)-এর উপযুক্ত উপভোক্তা হিসেবে। সরকারি সহায়তায় এখন তিনি ক্যানসার-মুক্ত, পঞ্চায়েত হেল্পডেস্কে নিয়মিত কাজ করেন এবং ‘লাইফ হাউজিং স্কিম’-এর আওতায় নিজের একটি পাকা বাড়িতে থাকেন।
রেম্যার গল্প আসলে কেরলের (Kerala Poverty) নতুন ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। এক রাজ্যের যা খুব শীঘ্রই ভারতের প্রথম ‘চরম দারিদ্রমুক্ত রাজ্য’ হিসাবে নাম লেখাতে চলেছে।
কেরলের দারিদ্রবিরোধী লড়াই
রাজ্যের স্থানীয় স্বশাসন দফতর (LSGD) পরিচালিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল একটাই। যেন কেউই ‘চরম দারিদ্র’ সীমার নীচে না থাকে। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আয় এবং বাসস্থান— এই পাঁচটি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জীবনমান উন্নয়নের দিকেই মূল নজর দেওয়া হয়।
রাজ্য জুড়ে জরিপ চালিয়ে ৬৪,০০৬টি পরিবারকে ‘অতিদরিদ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে মোট ১,০৩,০৯৯ জন নাগরিক এখন খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ পেয়েছেন।
রাজ্যের এলএসজিডি মন্ত্রী এম বি রাজেশ জানিয়েছেন, “এই প্রকল্প ছিল বর্তমান এলডিএফ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত। পাঁচ বছরে দারিদ্র নির্মূলের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। আমরা শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছি।”
মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগ ও প্রশাসনিক সমন্বয়
মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন নিজেই এই প্রকল্পের ধারণা দেন এবং সব দফতরের কার্যক্রম একত্রিত করে অগ্রগতি তদারকি করেন। রাজেশ বলেন, “বিভিন্ন দফতরের উদ্যোগকে মুখ্যমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে একত্রিত করাই এই প্রকল্প সফল হওয়ার মূল কারণ।”
রাজ্যের নানা প্রান্তের যাযাবর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী— যাঁরা আগে সরকারি সাহায্যের কথা জানতেনই না তাঁদেরও আনা হয়েছে এই পরিকল্পনার আওতায়। প্রতিটি পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি হয়েছে ‘মাইক্রোপ্ল্যান’। কাউকে চিকিৎসা, কাউকে খাদ্য, কারও ঘর, কারও আয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।
সংখ্যায় কেরলের সাফল্য
জরিপ অনুযায়ী, দারিদ্র্যের পাঁচটি প্রধান কারণ ছিল—
৩৫% পরিবারের আয়ের ঘাটতি
২৪% স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা
২১% খাদ্যাভাব
১৫% আশ্রয়হীনতা
এই সমস্যাগুলিকে নির্ভরযোগ্যভাবে চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে সমাধান করেছে রাজ্য সরকার। এখন পর্যন্ত ৭,০৮৩টি নিরাপদ বাড়ি নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে।
মানবিক সাফল্যের গল্প
ইদুক্কির মাম্কুকাম গ্রামের ৬৭ বছরের দাস রাজ জানিয়েছেন, “আগে টিনের ছাউনি দেওয়া কুঁড়েঘরে থাকতাম। এখন সরকারের সাহায্যে দুই ঘর-এক হল-এক রান্নাঘর-সহ পাকা বাড়ি পেয়েছি।”
আরেক দিকে, কুমারমঙ্গলমের দৃষ্টিহীন রাস্তার গায়ক শি ভার্ঘেস এখনও নতুন বাড়িতে উঠতে পারেননি, কারণ রাস্তা ও বিদ্যুৎ সংযোগের অভাব। স্থানীয় প্রশাসন তাঁকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
মন্ত্রী রাজেশ স্বীকার করেছেন, “৬০ হাজারের বেশি পরিবারকে দারিদ্র থেকে মুক্ত করা গেলেও ভবিষ্যতে নতুন পরিবার এই শ্রেণিতে পড়তে পারে। তাই সরকার এখন এই কর্মসূচির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে নতুন প্রকল্প নিয়ে ভাবছে।”
কেরল ইতিমধ্যেই চিনের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় রাজ্য হিসেবে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণে সাফল্যের দাবি করছে। ১ নভেম্বর, রাজ্য প্রতিষ্ঠা দিবসে, এই ঘোষণা হবে আনুষ্ঠানিকভাবে।