রাজস্থানের জয়সলমেরে যুগান্তকারী আবিষ্কার। গত সপ্তাহে মেঘা গ্রামে স্থানীয়দের হাতে যে জীবাশ্ম উদ্ধার হয়েছিল, তা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জানালেন সেটি আসলে ‘ফাইটোসর’-এর জীবাশ্ম।

ফাইটোসরের জীবাশ্ম
শেষ আপডেট: 25 August 2025 20:27
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাজস্থানের (Rajasthan) জয়সলমেরে (Jaisalmer) যুগান্তকারী আবিষ্কার। গত সপ্তাহে মেঘা গ্রামে স্থানীয়দের হাতে যে জীবাশ্ম (Fossil) উদ্ধার হয়েছিল, তা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জানালেন সেটি আসলে ‘ফাইটোসর’ (Phytosaur)-এর জীবাশ্ম। ভারতের মাটিতে এটাই প্রথম এত ভালভাবে সংরক্ষিত ফাইটোসরের (Phytosaur) নিদর্শন।
প্রায় দু’মিটার লম্বা এই জীবাশ্মটি মেঘা গ্রামের এক প্রাচীন হ্রদের পাশে খননকাজ চলাকালীন মেলে। গ্রামবাসীরা সেটি প্রথমে জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব দফতরকে জানান। পরে ভূতত্ত্ববিদদের একটি দল নিশ্চিত করেন, এটি প্রায় ২০ কোটি বছর পুরনো এক ফাইটোসরের জীবাশ্ম, যার পাশে মিলেছে একটি জীবাশ্মে রূপান্তরিত ডিমও। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সেটিও ওই সরীসৃপটির হতে পারে।
জয় নারায়ণ ব্যাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান বিভাগের ডিন তথা প্রবীণ জীবাশ্মবিদ অধ্যাপক ভিএস পরিহার জানিয়েছেন, “ফাইটোসর দেখতে অনেকটা কুমিরের মতো। এটি ছিল মাঝারি আকারের, নদীর ধারে থাকত এবং মাছ খেয়ে বাঁচত।” তাঁর কথায়, “ফাইটোসর প্রায় ২২.৯ কোটি বছর আগে উদ্ভূত হয়েছিল। জয়সলমেরে পাওয়া এই জীবাশ্ম সম্ভবত জুরাসিক যুগের গোড়ার দিককার।”
এর আগে ২০২৩ সালে বিহার-মধ্যপ্রদেশ সীমান্তে ফাইটোসরের মতো একটি জীবাশ্মের খোঁজ মিলেছিল। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, জয়সলমেরে পাওয়া এই নমুনাই প্রথম নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত ফাইটোসর ভারতের মাটিতে।
ভূতত্ত্ববিদ ড. নারায়ণ দাস ইনাখিয়া জানিয়েছেন, জয়সলমেরের লাঠি ফরমেশন অঞ্চল জুরাসিক যুগে (প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে) ছিল জলজ প্রাণের এক বিশাল ভাণ্ডার। তাঁর কথায়, “তখন এই অঞ্চলের এক দিকে ছিল নদী, অন্য দিকে সমুদ্র। ফলে জলজ জীবের বসবাসের আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেই কারণেই ফাইটোসরের জীবাশ্ম এখানে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।”
লাঠি ফরমেশন প্রায় ১০০ কিলোমিটার লম্বা এবং ৪০ কিলোমিটার চওড়া। এখানকার শিলাস্তর ইঙ্গিত দেয়, একসময় এই এলাকা জলে ভরা ছিল। তাই বারবার নানা প্রাগৈতিহাসিক জীবাশ্মের সন্ধান মিলছে। এর আগে থিয়াতে হাড়ের জীবাশ্ম, ডাইনোসরের পায়ের ছাপ এবং ২০২৩ সালে একটি অক্ষত ডাইনোসরের ডিমও আবিষ্কৃত হয়েছিল। এবারে মেঘা গ্রামে মেলা জীবাশ্ম সেই তালিকায় সংযোজন করল আর এক নতুন অধ্যায়।
গ্রামবাসীরা জীবাশ্ম আবিষ্কারের পরই সেটির ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেন। অনেকে তা দেখতে ভিড় জমানোয় এলাকায় ছোটখাটো কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ে।
ফাইটোসর দেখতে প্রায় হুবহু কুমিরের মতো হলেও আসলে তারা ভিন্ন প্রজাতি। এদের ছোট পা, ভারী দেহ, শক্ত আঁশে ঢাকা শরীর, লম্বা লেজ ও দাঁতভরা থুতনি ছিল। তবে মূল পার্থক্য নাসারন্ধ্রে— কুমিরের নাক থাকে থুতনির ডগায়, আর ফাইটোসরের নাক থাকত চোখের সামনের উঁচু অংশে।
ড. ইনাখিয়া মনে করেন, এই ধরনের আবিষ্কার জয়সলমেরকে ভূতাত্ত্বিক পর্যটনের কেন্দ্র করে তুলতে পারে। তাঁর কথায়, “এখানে ডাইনোসরের হাড়, ডিম, সামুদ্রিক জীবাশ্ম, এমনকি প্রাচীন বৃক্ষের জীবাশ্মও পাওয়া গেছে। এগুলি সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।”
তিনি আরও জানান, সীমান্তবর্তী তনোট অঞ্চলের কাছে ভূগর্ভস্থ সরস্বতী নদীর চ্যানেলও বৈজ্ঞানিকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। ভূতাত্ত্বিক হিসেবে এই চ্যানেলগুলি তুলনামূলক সাম্প্রতিক— বৈদিক যুগেরও অন্তত ৫-৬ হাজার বছর আগেকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রত্নজীবাশ্ম শুধু ভারতের বৈজ্ঞানিক মানচিত্রে জয়সলমেরকে অনন্য আসনেই বসাচ্ছে না, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এটি পর্যটন ও গবেষণার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।