উপরাষ্ট্রপতি ধনখড়ের পদত্যাগ ছিল দীর্ঘদিনের সংঘাতের পরিণতি। ছবি, গাড়ি, বৈঠকের দাবি এবং ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব ঘিরে কীভাবে সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়?

জগদীপ ধনকড়।
শেষ আপডেট: 24 July 2025 16:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড়ের আচমকা পদত্যাগ যে শুধুই একটি দিনের ঘটনা নয়, অথবা এর কারণ যে কেবলই তাঁর আচমকা অসুস্থতা নয়, অনেক দিন ধরেই যে কিছু টানাপড়েন জমে উঠেছিল, তা নিয়ে প্রায় সকলেই একপ্রকার নিশ্চিত। জাতীয় রাজনীতিতে চর্চা চলছে, পুরনো কোনও চিড় থেকেই এই ফাটল তৈরি হয়েছে।
জানা যায়, সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল একাধিক দাবিকে ঘিরে। সে সবের মধ্যে ছিল নিজের ছবিকে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ছবির পাশে বসানো থেকে শুরু করে মার্সিডিজ গাড়ি পর্যন্ত। সর্বশেষে, বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে বিরোধীদের ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব গৃহীত করার সিদ্ধান্তেই হয়তো শেষপর্যন্ত তলানিতে ঠেলে দেয় সম্পর্ক।
তথ্য অনুযায়ী, সরকার তিনবার চেষ্টা করেছিল ধনকড়কে বোঝাতে, যেন তিনি বিরোধীদের পক্ষ থেকে আনা বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব গ্রহণ না করেন। কারণ সেই বিচারপতির বাড়ি থেকে আগেই বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার হয়েছিল। কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে ধনকড় বিরোধী সাংসদদের স্বাক্ষর গ্রহণ করেন এবং সেই প্রস্তাব গৃহীত করবেন বলে জানান। এতেই চূড়ান্ত অসন্তোষ ছড়ায়।
জানা গিয়েছে, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরণ রিজিজু, আইনমন্ত্রী অর্জুন মেঘওয়াল এবং রাজ্যসভার নেতা জেপি নাড্ডা তিন দফায় ধনকড়ের সঙ্গে দেখাও করেন। তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সরকারকে অন্তর্ভুক্ত করে, শাসক ও বিরোধী উভয়ের যৌথ সিদ্ধান্তে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব তোলা হোক। কিন্তু ধনকড় তাতে রাজি হননি।
এমনকি বাদল অধিবেশন শুরুর চার-পাঁচ দিন আগেই রিজিজু তাঁকে জানান, লোকসভায় শাসক দলের পক্ষ থেকেও ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হবে। রাজ্যসভাতেও তা পেশ করা হবে, এমনই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সরকারপক্ষের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ধনকড় বিরোধীদের স্বাক্ষর নিয়েই সেই প্রস্তাব পেশ করেন।
তবে এই ইমপিচমেন্ট-বিতর্ক ছাড়াও, ধনকড়ের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল আরও নানা বিষয় নিয়েই। সূত্রের খবর, তিনি চাইতেন, তাঁর ছবি সমস্ত মন্ত্রীদের অফিসে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবির পাশে লাগানো হোক। নিজের গাড়ির পুরো কনভায় মার্সিডিজ-বেঞ্জে বদলে দেওয়া হোক। সেই সঙ্গে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারত সফরে এলে তিনিই যেন তাঁর সঙ্গে মূল বৈঠক করেন।
এই শেষ দাবিকে কেন্দ্র করে একবার ক্যাবিনেটের এক শীর্ষমন্ত্রী তাঁকে বোঝান, জেডি ভ্যান্স মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টের বার্তা নিয়ে এসেছেন, তাই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেই দেখা করবেন।
ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব নিয়ে সরকারের আপত্তির মধ্যেই ধনকড় গোপনে এক সিনিয়র কংগ্রেস নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর বিরোধীদের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। সোমবার সকালে পরিষ্কার হয়ে যায়, ধনকড় বিরোধীদের স্বাক্ষর গ্রহণ করেছেন এবং সেই দিনই প্রস্তাবটি রাজ্যসভায় উপস্থাপন করবেন।
এই প্রেক্ষিতেই সোমবার হঠাৎ করে ধনকড় যান রাষ্ট্রপতি ভবনে। প্রায় ২৫ মিনিট অপেক্ষার পর তিনি রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগপত্র জমা দেন। আশা করেছিলেন, সরকার হয়তো তাঁকে ফেরাতে চেষ্টা করবে বা পদত্যাগপত্র গ্রহণ না-ও করতে পারে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত তেমন কোনও উদ্যোগ হয়নি। কারণ, তখনই সরকার স্থির করে নেয়, ধনকড়কে আর রাখা যাবে না।
ঘটনার পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-সহ একাধিক শীর্ষ নেতার বৈঠক হয়। সূত্রের খবর, যেখানে ধনকড়ের আচরণে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন মোদী। কারণ ২০২২ সালে ধনকড় এনডিএ প্রার্থী হিসেবেই উপরাষ্ট্রপতির পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে যেন স্পষ্ট হয়ে গেল, সরকার ও ধনকড়ের সম্পর্ক কোনও একদিনে ভাঙেনি, বরং তা দীর্ঘদিনের জমে থাকা দূরত্বেরই পরিণতি।