ঝাড়বাতির (chandelier) আলোয় বরফঠান্ডা গ্লাসে (frosted glasses) ঠোকাঠুকি চলছিল, আর অতিথিদের দেশের সর্বোচ্চ প্রধান সম্মান জানালেন নিজের বাড়ির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র দিয়ে। যার চলিত নাম পেটপুজো।
.jpeg.webp)
অতিথি ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কোস্তা এবং ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েন।
শেষ আপডেট: 29 January 2026 17:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যাঁরাই রাষ্ট্রপতি ভবনের (Rashtrapati Bhavan) পাশ দিয়ে হেঁটেছেন, তাঁদের হয়তো হঠাৎ করেই নাকে এসে লেগেছিল হিমালয়ের হেঁসেলঘরের (Himalayan kitchen) গন্ধ। ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে সই হয়ে গেছে, ভাষণ হয়ে গেছে, দুই মহা-দেশের কূটনীতিও নিজের সেরা রূপ দেখিয়েছে। তারপর এল আসল আকর্ষণ। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু (President Droupadi Murmu) আয়োজিত সেই রাজকীয় নৈশভোজ (state banquet), যেখানে অতিথি ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কোস্তা (European Council President Antonio Costa) এবং ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েন (European Commission President Ursula von der Leyen)।
ঝাড়বাতির (chandelier) আলোয় বরফঠান্ডা গ্লাসে (frosted glasses) ঠোকাঠুকি চলছিল, আর অতিথিদের দেশের সর্বোচ্চ প্রধান সম্মান জানালেন নিজের বাড়ির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র দিয়ে। যার চলিত নাম পেটপুজো। তাও আবার স্রেফ জাঁকজমক নয়, গল্প বলার মতো একটা মেনু (curated menu), যা ভারতের রান্নার ঐতিহ্যকে (culinary heritage ইউরোপের সামনে তুলে ধরে। বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলের পাকপ্রণালীকে (Himalayan flavours)।
এই পুরো মেনু সাজিয়েছিলেন হিমাচল প্রদেশের কাসৌলিতে (Kasauli) থাকা শেফ প্রতীক সাধু (Chef Prateek Sadhu) এবং শেফ কমলেশ নেগী (Chef Kamlesh Negi)। তাঁরা কাশ্মীর (Kashmir), লাদাখ (Ladakh), হিমাচল প্রদেশ (Himachal Pradesh), উত্তরাখণ্ড (Uttarakhand) আর উত্তর-পূর্ব ভারতের (Northeast) রান্নাঘর থেকে তুলে এনে সাজিয়েছিলেন টেবিল। পাহাড়ি খাবারগুলিকে তাঁরা আধুনিক ফাইন ডাইনিং (fine-dining) ছাঁদে পরিবেশন করলেও মূল স্বাদ, উপকরণ (regional ingredients), ফারমেন্টেশন (fermentation) আর ধীরে রান্নার (slow-cooked techniques) ঐতিহ্য একেবারে অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন।
শুরুর প্লেটে ছিল জখিয়া আলু (jakhiya aloo) আর গ্রিন টম্যাটোর চাটনি (green tomato chutney)। উত্তরাখণ্ডের আলু পরিবেশন করা হয়েছিল খাস্তা মঠরি টার্টের (mathri tart) ওপর। সঙ্গে ছিল ঝাঙ্গোরা কি ক্ষীর (jhangora ki kheer), সাধারণ জোয়ারে পুডিং (millet pudding), সাদা চকোলেটের (white chocolate) খোলসে মোড়া, আর উপর থেকে ছিটানো মেঘালয়ের ‘মেহ’ বেরি সল্ট (meah berry salt)। স্বাদটা যেন চেনা, অথচ একেবারে নতুন— প্রাদেশিক আত্মা না হারিয়েও আধুনিক রূপ।
শীতের সন্ধ্যায় গরম স্যুপ (hot soup) না থাকলে তো চলে না। তাই পরের কোর্সে এল সুন্দরকলা থিচোনি (sunderkala thichoni) উত্তরাখণ্ডের মুন্সিয়ারি (Munsiyari) এলাকার বাকহুইট নুডল (buckwheat noodle), যার মধ্যে ছিল তিব্বতি প্রভাবের (Tibetan influence) ছোঁয়া। রোস্টেড টম্যাটো, ফারমেন্টেড সবজি আর হালকা আলু-শালগমের ঝোলে (potato and turnip broth) বানানো এই পদ যেন পাহাড়ি ঠান্ডায় গা গরম করে দিল। তার সঙ্গে পরিবেশন করা হয়েছিল বেকড ইয়াক চিজ কাস্টার্ড (baked yak cheese custard) আর ভাঙ মাঠরি (bhaang mathri), মানে হেম্প ক্রিস্প (hemp crisp)। স্বাদে যেমন আলাদা, দর্শনেও (texture) তেমনই চমক।

এরপর এল বিচ্ছু বুটি পাতা (bichhu buti patta), মানে স্টিংগিং নেটল লিফ (stinging nettle leaf), যেটা হিমালয়ের সর্ষে (Himalayan mustard) দিয়ে গ্লেজ করা, সঙ্গে জল ঝরানো লাউ (dehydrated lauki)। আর শীতের গাজর কড়ি (winter carrot kadhi) যেন একেবারে ঘরের আরাম এনে দিল—ঝাল, মশলা আর উষ্ণতার নিখুঁত মিশেল। তার পরের প্লেট ছিল কুমায়ুনী স্যালাড (Kumaoni salad)— নিম্বু সাঁ (nimbu saan)। পাহাড়ি লেবু (hill lemon), সবুজ রসুন (green garlic), দই (yoghurt), হেম্প আর লঙ্কা লবণ (chilli salt), মিষ্টি আর নোনতার অসাধারণ ভারসাম্য। এই পদ কুমায়ুন অঞ্চলের (Kumaon) স্থানীয় মানুষের প্রথাগত খাবার। শেফ সাধু নাকি উত্তরাখণ্ডের সারমোলি (Sarmoli) গ্রামে গিয়ে প্রথম এর স্বাদ পেয়েছিলেন, তারপর আর থামতেই পারেননি। শেষ পর্যন্ত সেই স্বাদই জায়গা পেল রাষ্ট্রপতির নৈশভোজে।
মেন কোর্সে (main course) ছিল পাহাড়ি দামী উপকরণের (prized mountain produce) রাজত্ব। কাশ্মীরি গুচ্চি (Kashmiri guchhi), মানে মোরেল মাশরুম (morels), আর সোলান মাশরুম (Solan mushrooms) পরিবেশন করা হয়েছিল পোস্ত (poppy seeds) আর পোড়া টম্যাটো সসের (burnt tomato sauce) সঙ্গে। সঙ্গে ছিল হিমাচলী স্বর্ণ অন্ন (Himachali swarnu rice)। তার পাশে তিন রকমের চাটনি— রাই পাতা (rai leaf), কাশ্মীরি আখরোট (Kashmiri walnut), রোস্টেড টম্যাটো আর আখুনি (akhuni)— প্রতিটা আলাদা অঞ্চলের স্বাদ এনে দিল।
ডেজার্ট (dessert) এল একেবারে মোলায়েম ভঙ্গিতে। হিমালয়ান রাগি (Himalayan ragi) আর কাশ্মীরি আপেল কেক (Kashmiri apple cake), সঙ্গে তিমুরু (timru) আর সি বকথর্ন ক্রিম (sea buckthorn cream)। তার পর অসমের ডিমা হাসাও (Dima Hasao) এলাকার কফি বিন দিয়ে বানানো কাস্টার্ড (coffee custard), খেজুর (dates) আর কাঁচা ক্যাকাও (raw cacao)। শেষে হিমালয়ের মধু (Himalayan honey) মাখানো পার্সিমন (persimmon) আর জাম্বিরি লেবু (jambhiri lemon) মিলিয়ে একেবারে রাজকীয় পরিসমাপ্তি।
খাবারের পাশাপাশি নজর কাড়ে উরসুলা ফন ডার লেয়েনের (Ursula von der Leyen) কূটনৈতিক ফ্যাশন (diplomatic fashion)। নৈশভোজের জন্য তিনি পরেছিলেন আব্রাহাম অ্যান্ড ঠাকুরের (Abraham and Thakore) হলুদ কুর্তা জ্যাকেট (yellow kurta jacket), সঙ্গে হলুদ-লাল বান্ধনি স্টোল (bandhani stole)। শুধু এই সন্ধ্যায় নয়, গোটা সফর জুড়েই তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভারতীয় ডিজাইনারদের (Indian designers) বাছাই করা পোশাক। খুব বেশি জাঁকজমক নয়, ইউরোপীয় সৌন্দর্যের উপর ভারতীয়ত্বের মুখোশ চাপিয়ে দেওয়া নয়— শান্ত, মার্জিত, আর নিঃশব্দে ভারতীয় পোশাক রাজকীয়কতা ঘিরে ছিল তাঁকে।