বিশ্বের অন্য যে কোনও বড় অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে ভারতের বৃদ্ধির হার (growth rate) স্পষ্টভাবেই আলাদা করে চোখে পড়ে। তাঁর কথায়, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে (global scenario) ভারত একটি বাস্তব অর্থেই মরূদ্যান (oasis of growth)।

সংসদে পেশ হওয়া আর্থিক সমীক্ষা নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন।
শেষ আপডেট: 29 January 2026 15:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্ব আর্থিক ভারসাম্যের অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যযুদ্ধ (trade war) আর ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের (geopolitical tension) মধ্যেও ভারত এখন কার্যত অর্থনৈতিক অবস্থার (economic performance) একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। সংসদে পেশ হওয়া আর্থিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬ (Economic Survey 2025-26) নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরন (Chief Economic Adviser) বলেন, বিশ্বের অন্য যে কোনও বড় অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে ভারতের বৃদ্ধির হার (growth rate) স্পষ্টভাবেই আলাদা করে চোখে পড়ে। তাঁর কথায়, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে (global scenario) ভারত একটি বাস্তব অর্থেই মরূদ্যান (oasis of growth)।
এই সমীক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিধিনিষেধ শিথিলকরণ (deregulation) প্রক্রিয়াকে। নাগেশ্বরন জানান, এই ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলির (state governments) অংশগ্রহণ অত্যন্ত সক্রিয়। বিশেষ করে জমি (land), ভবন ও নির্মাণ (building and construction), শ্রম আইন (labour laws), পরিষেবা (utilities) এবং বিভিন্ন সরকারি অনুমোদনের (permissions) মতো ক্ষেত্রে রাজ্যগুলি উৎসাহের সঙ্গে সংস্কারে এগিয়ে এসেছে। এর ফলে ব্যবসার পরিবেশ (business environment) আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে এবং বিনিয়োগের (investment) ক্ষেত্রেও গতি এসেছে। তিনি আরও বলেন, এখন সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে ডিরেগুলেশনের দ্বিতীয় ধাপ বা ফেজ টু (phase 2 of deregulation) শুরু করার।
আর্থিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, কমপ্লায়েন্স রিডাকশন অ্যান্ড ডিরেগুলেশন ইনিশিয়েটিভ (Compliance Reduction and Deregulation Initiative) প্রকল্পের আওতায় রাজ্য স্তরে সংস্কারের জন্য মোট ২৩টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলি পাঁচটি বড় সেক্টরের (sectors) মধ্যে ভাগ করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রক (central ministries), রাজ্য সরকার, শিল্প সংগঠন (industry associations) ও বিভিন্ন সংস্থার (knowledge partners) সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার ভিত্তিতেই এই তালিকা তৈরি হয়েছে। সমীক্ষার ভাষায়, ডিরেগুলেশন রাজ্যের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া নয়, বরং সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করার একটি প্রক্রিয়া। এবারের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, রাজ্যগুলির সঙ্গে ধারাবাহিক সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শেখার চেষ্টা।
বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘স্বদেশি’ (swadeshi) নীতির গুরুত্ব নিয়েও স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তাঁর মতে, যখন বাণিজ্য আর পারস্পরিক বা নিরপেক্ষ নেই, তখন স্বদেশি একটি বৈধ অস্ত্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ২০২৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের (Independence Day 2025) ভাষণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আগে দেশের মধ্যেই প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন (competitive manufacturing) গড়ে তুলতে হবে। উৎপাদন ও রফতানিতে উদ্বৃত্ত তৈরি হলে মূলধনের খরচ (cost of capital) কমবে এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আসবে।
২০২৬ সালের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির (global economy) তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপটও তুলে ধরেন নাগেশ্বরন। প্রথম দৃশ্যপটে ২০২৫ সালের মতো পরিস্থিতি মোটামুটি বজায় থাকবে, যার সম্ভাবনা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। দ্বিতীয় দৃশ্যপটে বিশৃঙ্খল বহু-মেরুকরণ দেখা দিতে পারে, যার সম্ভাবনা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। তৃতীয় দৃশ্যপটে ধারাবাহিক বৈশ্বিক ধাক্কা বা সিস্টেমিক শক (systemic shock cascade) নামতে পারে, যার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম, প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ।
বাণিজ্যযুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতকে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বের (personality) ফল বলে মানতে নারাজ প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তাঁর মতে, এগুলি আসলে ১৫ থেকে ১৮ বছর আগে নেওয়া কাঠামোগত সিদ্ধান্তের (structural choices) ফল। সেই সিদ্ধান্তগুলির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক পথে এগিয়েছে, যেখান থেকে আর সহজে ফিরে আসা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতির প্রভাব আগামী পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত টের পাওয়া যাবে বলেই মনে করেন তিনি। তাই ভারতের নীতি নির্ধারণ (policy options) ও অগ্রাধিকার (priorities) ঠিক করতে গেলে এই বাস্তবতাকে মেনেই এগোতে হবে।
সব মিলিয়ে আর্থিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬-এর মূল বার্তা হল, বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা, শুল্ক যুদ্ধ (tariff war) আর রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেও ভারত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ডিরেগুলেশন, স্বদেশি উৎপাদন এবং কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়— এই তিনটি স্তম্ভের উপর ভর করেই আগামী দিনে ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ (economic future) আরও মজবুত হওয়ার আশা দেখাচ্ছে সরকার।