আর্থিক সমীক্ষার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দামে যে অভূতপূর্ব উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা কোনও সাময়িক বা চক্রাকার ঘটনা নয়। বরং বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকিবোধ, প্রকৃত সুদের হার এবং আর্থিক সম্পদের উপর আস্থার গভীর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।

শেষ আপডেট: 29 January 2026 15:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আর্থিক বাজারের অস্থিরতার আবহে ফের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সোনা (Gold)। ইকোনমিক সার্ভে ২০২৬ (Economic Survey 2026) স্পষ্ট করে জানাল, সোনা আর শুধু ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ের মাধ্যম নয়—বর্তমানে গোটা বিশ্বের যা পরিস্থিতি তাতে এটি ভারতের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পদ’ (Strategic asset)।
আর্থিক সমীক্ষার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দামে যে অভূতপূর্ব উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা কোনও সাময়িক বা চক্রাকার ঘটনা নয়। বরং বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকিবোধ, প্রকৃত সুদের হার এবং আর্থিক সম্পদের উপর আস্থার গভীর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
বিশ্ব অস্থিরতার মধ্যে সোনার দাম (Gold Price)
ইকোনমিক সার্ভে জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রতি আউন্সে ২,৬০৭ ডলার থেকে বেড়ে ৪,৩১৫ ডলারে পৌঁছয়। দুর্বল মার্কিন ডলার, দীর্ঘদিন ধরে কম প্রকৃত সুদের হার এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিই এই উত্থানের মূল কারণ।
২০২৬ সালের শুরুতেও সেই ধারা অব্যাহত—২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সোনার দাম ছুঁয়েছে আউন্স প্রতি প্রায় ৫,১০১ ডলার। সার্ভের ভাষায়, এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা কতটা শক্তিশালী।ইকোনমিক সার্ভের কথায়, “ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাণিজ্য বিভাজন এবং আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ ইতিমধ্যেই বাজারের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে—আর তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সোনার দাম”।
ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডারে সোনার শক্তি
শুধু মুদ্রাস্ফীতি নয়, ভারতের বৈদেশিক ক্ষেত্রেও সোনার ভূমিকা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। ইকোনমিক সার্ভে জানাচ্ছে, ২০২৬ অর্থবর্ষে ভারতের ফরেক্স রিজার্ভে সোনার অংশ উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে সোনার রিজার্ভের মূল্য ছিল ৭৮.২ বিলিয়ন ডলার।
২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৭.৫ বিলিয়ন ডলার।
এই বৃদ্ধির পিছনে যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার উচ্চ মূল্য রয়েছে, তেমনই রয়েছে ডলারনির্ভর সম্পদের বাইরে গিয়ে রিজার্ভ বৈচিত্র্য করার প্রবণতা। সার্ভে জানাচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বহু উদীয়মান অর্থনীতিই একই পথে হাঁটছে।
মুদ্রাস্ফীতিতে সোনার প্রভাব
সার্ভে অনুযায়ী, সোনার দাম বৃদ্ধি ভারতের মুদ্রাস্ফীতির ছবিকেও প্রভাবিত করেছে। ২০২৬ অর্থবর্ষে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলেও কোর ইনফ্লেশন তুলনামূলকভাবে কিছুটা ‘স্টিকি’ বা স্থায়ী রয়ে গেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সোনা ও রুপোর মতো মূল্যবান ধাতুর উচ্চ মূল্য।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ অর্থবর্ষে গড় কোর ইনফ্লেশন ছিল প্রায় ৩.৫%। ২০২৬ অর্থবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় **৪.৩%। তবে সোনা ও রুপো বাদ দিলে ছবিটা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যবান ধাতু বাদ দিয়ে কোর ইনফ্লেশন ৩.৪% থেকে কমে ২.৩%-এ নেমেছে। অর্থাৎ চাহিদাজনিত অতিরিক্ত চাপ অর্থনীতিতে নেই বললেই চলে।
ভাঙাচোরা বিশ্বব্যবস্থায় সোনাই ভরসা
ইকোনমিক সার্ভের মূল্যায়নে, বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি খণ্ডিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। বাণিজ্য ও আর্থিক সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাই বেশি প্রভাব ফেলছে। ফলে বাজারের ‘সেফটি মার্জিন’ ক্রমশ কমছে।
এই প্রেক্ষিতে সার্ভের সতর্কবার্তা হল—“বিশ্ব আর্থিক বাজারে নিরাপত্তার পরিসর সঙ্কুচিত হওয়ায় সামান্য ধাক্কাও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।” ঠিক এই জায়গাতেই সিস্টেমিক ঝুঁকি মোকাবিলার ঢাল হিসেবে সোনা আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইকোনমিক সার্ভে ২০২৬-এর সারকথা একটাই—সোনা আজ আর শুধু আবেগ বা ঐতিহ্যের প্রতীক নয়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার মজবুত করা এবং বিশ্ব ঝুঁকির ব্যারোমিটার হিসেবে সোনা ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এক কৌশলগত স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। এক অনিশ্চিত ও বিভক্ত বিশ্ব ব্যবস্থায়, এই হলুদ ধাতুর গুরুত্ব যে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেশি—তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।মনে রাখতে হবে, এই প্রতিবেদনটিতে শুধু তথ্য জানানো হয়েছে। এটা কোনও বিনিয়োগের পরামর্শ নয়। বিনিয়োগের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।