ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের অতিরিক্ত ঝুঁকি মিলিয়ে আগামী দিনে এমন এক আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে সার্ভে, যা ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের থেকেও ভয়াবহ হতে পারে।

শেষ আপডেট: 29 January 2026 15:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক সমীক্ষা (Economic Survey 2026) যে ইঙ্গিত দিল তা মোটেই লক্ষ্মীমন্ত নয়। বরং ইকোনমিক সার্ভের সাফ সতর্কবার্তা হল, বিশ্ব অর্থনীতির ভিত বড়ই নড়বড়ে হয়ে উঠছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগের অতিরিক্ত ঝুঁকি মিলিয়ে আগামী দিনে এমন এক আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছে সার্ভে, যা ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের থেকেও ভয়াবহ হতে পারে।
সার্ভের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আপাতত বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থিতিশীল দেখালেও এই ‘স্থিতি’ বিভ্রান্তিকর। কারণ, নেতিবাচক প্রভাব অনেক সময়ে দেরিতে আছড়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বড় প্রমাণ হল ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পলিসি আনসার্টেনটি ইনডেক্স’ তথা বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার সূচক, যা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।
বিশ্ব আর্থিক বাজারে ২০২৬ সালের ৩ সম্ভাব্য ছবি
ইকোনমিক সার্ভে আগামী বছরের জন্য তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলেছে—
১) ‘বেস্ট কেস’ বা নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতা (সম্ভাবনা ৪০–৪৫%)
এই পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের মতোই অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকবে। তবে নিরাপত্তার মার্জিন হবে খুব কম। সামান্য ধাক্কাও বড় অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। বাজারে টানাপোড়েন, বাণিজ্য সংঘাত ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ থাকলেও তা পুরো ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলবে না। সরকারগুলিকে বারবার হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামলাতে হবে।
২) বিশৃঙ্খল বহুমুখী বিভাজন (সম্ভাবনা ৪০–৪৫%)
এই চিত্রে বিশ্ব আরও বেশি বিভক্ত হবে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত ও অ-স্থিতিশীল রূপ নেবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা, চাপিয়ে দেওয়া শর্ত ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙবে, আর্থিক চাপ এক দেশ থেকে আর এক দেশে দ্রুত ছড়াবে। প্রতিটি দেশকে তখন স্বায়ত্তশাসন, বৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার মধ্যে কঠিন সমঝোতা করতে হবে।
৩) সবচেয়ে ভয়াবহ ‘সিস্টেমিক শক’ (সম্ভাবনা ১০–২০%)
সবচেয়ে উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতিতে আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কট একে অপরকে বাড়িয়ে তুলবে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তি খাতে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগ বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
সোনার দামে রেকর্ড উত্থান, উদ্বেগের ইঙ্গিত
বিশ্ব বাজারে সোনার দাম ২০২৫ সালে প্রতি আউন্সে ২,৬০৭ ডলার থেকে বেড়ে ৪,৩১৫ ডলারে পৌঁছয়। ২০২৬ সালেও সেই ধারা অব্যাহত—দাম বেড়ে প্রায় ৫,৬০০ ডলার হয়েছে, অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। ডলারের দুর্বলতা, নেতিবাচক প্রকৃত সুদের হার ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কাই এর মূল কারণ।
ভারতের জন্য কী বার্তা?
সবচেয়ে বড় স্বস্তির কথা—এই তিন পরিস্থিতিতেই ভারত তুলনামূলকভাবে ভালো জায়গায় থাকবে বলে মনে করছে সার্ভে। শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, কম আর্থিকীকৃত বৃদ্ধির মডেল ও শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার ভারতের ঢাল। তবে ভারত পুরোপুরি নিরাপদ নয়। মূল ঝুঁকির বিষয় হল—বিদেশি মূলধন প্রবাহে ব্যাঘাত ও টাকার উপর চাপ। চলতি বছরে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ৪১,২৮০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। এর জেরে এক বছরে টাকা প্রায় ৬ শতাংশ দুর্বল হয়ে ডলারের বিরুদ্ধে ৯২ টাকা ছুঁয়েছে।
ইকোনমিক সার্ভের ভাষায়, “২০২৬ সালের জন্য ভারতের কৌশল হওয়া উচিত ‘আত্মবিশ্বাসী সতর্কতা’—অতিরিক্ত ভয় নয়, বরং ঝাঁকুনি সামলানোর মতো প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত বাফার ও তারল্যের উপর জোর।” বিশ্ব যখন অস্থির, তখন ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনই সুযোগও কম নয়—এই বার্তাই স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছেন ইকোনমিক সার্ভে ২০২৬।