‘আরিধামন’ আসলে একটি গোপন প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরি ও পরিচালনা করা। এর আগে ২০১৬ সালে ‘আইএনএস অরিহন্ত’ এবং ২০২৪ সালের আগস্টে ‘আইএনএস অরিঘাত’ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 3 April 2026 13:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের প্রতিরক্ষাক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ইঙ্গিত মিলল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh) একটি সংক্ষিপ্ত বার্তায় জানিয়ে দিলেন এ এক নাম, যা শুধুই শব্দ নয়, বরং শক্তির প্রতীক - ‘আরিধামন’ (INS Aridhaman)। তাঁর এই বার্তার পরই স্পষ্ট হয়ে যায়, দেশের তৃতীয় স্বদেশে নির্মিত পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন ‘আইএনএস আরিধামন’ (INS Aridhaman) শুক্রবারই আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে।
এই সাবমেরিনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পারমাণবিক অস্ত্র বহনের ক্ষমতা। জলের গভীর থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম এই যুদ্ধজাহাজ ভারতের সমুদ্রভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। দেশের পারমাণবিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি আঘাত হানার ক্ষমতা যেমন বাড়াবে, তেমনই শত্রুর চোখ এড়িয়ে টিকে থাকার সামর্থ্যও বাড়াবে।

‘আরিধামন’ আসলে একটি গোপন প্রকল্পের অংশ, যার লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরি ও পরিচালনা করা। এর আগে ২০১৬ সালে ‘আইএনএস অরিহন্ত’ এবং ২০২৪ সালের আগস্টে ‘আইএনএস অরিঘাত’ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় সংযোজন ‘আরিধামন’। এর পর আরও একটি সাবমেরিন যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রায় সাত হাজার টন ওজনের এই সাবমেরিন আগেরগুলির তুলনায় কিছুটা বড়। এর গঠন আরও মসৃণ, ফলে শত্রুর নজর এড়িয়ে চলার ক্ষমতা অনেক বেশি। শব্দ কম তৈরি করায় এটিকে শনাক্ত করাও কঠিন। এতে রয়েছে উন্নত পারমাণবিক চুল্লি, যা গবেষণা সংস্থার উদ্যোগে তৈরি হয়েছে।
অস্ত্রের দিক থেকেও ‘আরিধামন’ অনেক এগিয়ে। এতে রয়েছে আটটি উল্লম্ব উৎক্ষেপণ নল, যা আগের সাবমেরিনের তুলনায় দ্বিগুণ। ফলে এটি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা স্বল্পপাল্লার একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে।
এই সাবমেরিন নৌবাহিনীতে যুক্ত হলে ভারতের একটি বড় কৌশলগত সুবিধা তৈরি হবে - সমুদ্রপথে নিরবচ্ছিন্ন প্রতিরোধ ব্যবস্থা। অর্থাৎ, সব সময় অন্তত একটি পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিন সমুদ্রে টহলে থাকবে। স্থল বা আকাশপথে আঘাত এলেও, জলের গভীরে থাকা এই সাবমেরিন পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম হবে। এই ক্ষমতাই শত্রুর প্রথম আঘাতের পরিকল্পনাকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়।
বর্তমানে ভারতের হাতে দুটি এমন সাবমেরিন রয়েছে। ‘আরিধামন’ যুক্ত হলে সেই সংখ্যা হবে তিন। চারটি সাবমেরিনের বহর তৈরি হলে, একদিকে টহল চলবে, অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণ বা প্রস্তুতি চলবে - ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কোনও ফাঁক থাকবে না।
এদিনই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিশাখাপত্তনম সফরের সঙ্গে মিলিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে চলেছে। উন্নত প্রযুক্তির স্টেলথ ফ্রিগেট ‘তারাগিরি’ও নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। এই যুদ্ধজাহাজে রয়েছে এমন এক শক্তিচালনা ব্যবস্থা, যা দ্রুতগতি ও দীর্ঘসময়ের অভিযানের জন্য উপযোগী।
এর গঠন এমনভাবে তৈরি, যাতে রাডারে সহজে ধরা না পড়ে। পাশাপাশি এতে রয়েছে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর মতো উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা - ভূমি থেকে ভূমিতে আঘাত হানার ক্ষেপণাস্ত্র, মাঝারি পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাবমেরিন ধ্বংসের বিশেষ প্রযুক্তি। শুধু যুদ্ধ নয়, বিপর্যয়ের সময় উদ্ধার ও সহায়তা কাজেও ব্যবহার করা যাবে এই জাহাজ। ফলে সামরিক শক্তির পাশাপাশি মানবিক দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
সব মিলিয়ে ‘আরিধামন’ ও ‘তারাগিরি’ - এই দুই সংযোজন ভারতের নৌক্ষমতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের সমুদ্রসীমা সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।