সংঘর্ষ চলাকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মূলত প্রথম রাতেই একটি ভারতীয় রাফাল যুদ্ধবিমানের ক্ষতির বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু সুইস রিপোর্টের বক্তব্য, ওই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা অভিযানের প্রকৃত ফলাফল আড়াল হয়ে গেছিল। বাস্তবে, ধাপে ধাপে পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও আক্রমণক্ষমতা ভেঙে দেয় ভারত এবং নিজের শর্তেই সংঘর্ষের ইতি টানে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 26 January 2026 16:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত বছরের মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযান (Operation Sindoor) শুধু একটি সামরিক প্রতিশোধ ছিল না - দক্ষিণ এশিয়ার আকাশযুদ্ধের (South Asia Air Zone) ভারসাম্যে এক মৌলিক বদল এনে দিয়েছিল। এমনই দাবি করেছে সুইৎজারল্যান্ডের একটি প্রভাবশালী সামরিক ইতিহাস ও কৌশল গবেষণা সংস্থা (Switzerland Study)।
তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চার দিনের তীব্র সংঘর্ষের শেষে কার্যত আকাশে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ভারত, যার জেরে যুদ্ধবিরতির পথে যেতে বাধ্য হয় পাকিস্তান।
সুইস গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর মিলিটারি হিস্ট্রি অ্যান্ড পার্সপেকটিভ স্টাডিজ (CHPM)-এর প্রকাশিত এই রিপোর্টটি লিখেছেন সামরিক ইতিহাসবিদ আদ্রিয়েন ফঁতানেল্লাজ। ২০২৫ সালের ৭ থেকে ১০ মে - মোট ৮৮ ঘণ্টার ভারত-পাকিস্তান আকাশযুদ্ধ নিয়ে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত ও স্বাধীন বিশ্লেষণ বলে মনে করছেন কৌশলবিদরা।
সংঘর্ষ চলাকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মূলত প্রথম রাতেই একটি ভারতীয় রাফাল যুদ্ধবিমানের (Rafale) ক্ষতির বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। কিন্তু সুইস রিপোর্টের বক্তব্য, ওই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা অভিযানের প্রকৃত ফলাফল আড়াল হয়ে গেছিল। বাস্তবে, ধাপে ধাপে পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও আক্রমণক্ষমতা ভেঙে দেয় ভারত এবং নিজের শর্তেই সংঘর্ষের ইতি টানে।
পহেলগামে পর্যটকদের উপর ভয়াবহ জঙ্গি হামলার (Pahalgam Attack) পরই শুরু হয় 'অপারেশন সিঁদুর' (Operation Sindoor)। নয়াদিল্লির দাবি ছিল, ওই হামলার পিছনে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলির হাত রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই প্রেক্ষিতে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে এমন এক জবাব পরিকল্পনার স্বাধীনতা দেয়, যা ভবিষ্যতে হামলা ঠেকাতে যথেষ্ট ‘দৃষ্টান্তমূলক’ হবে, এমনকি যদি তাতে উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি থাকে, তাহলেও অভিযান করতে হবে।
৭ মে ভোররাতে ভারতীয় বায়ুসেনা জইশ-ই-মহম্মদ (JeM) ও লস্কর-ই-তইবার (Laskar e Taiba) সঙ্গে যুক্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি পরিকাঠামোয় হামলা চালায়। বাহাওয়ালপুর ও মুরিদকে - এই দুই কেন্দ্রকে দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। পরবর্তী মূল্যায়নে দেখা যায়, একাধিক ভবন সম্পূর্ণ বা গুরুতরভাবে ধ্বংস হয়েছে। রিপোর্টের মতে, আগের যে কোনও অভিযানের তুলনায় এই হামলা ছিল অনেক বেশি গভীর ও সমন্বিত।
এর জবাবে পাকিস্তানও পাল্টা আক্রমণে নামে। প্রথম রাতেই কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় আকাশযুদ্ধ হয় - প্রায় ৬০টি ভারতীয় এবং ৪০টির বেশি পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান বিভিন্ন সেক্টরে অংশ নেয়। চিনা প্রযুক্তির PL-15 মিসাইল ও এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের সাহায্যে পাকিস্তান কিছু সাফল্য পায়। অন্তত একটি রাফাল, একটি মিরাজ ২০০০ এবং আরও একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুইস বিশ্লেষণে একে ভারতের জন্য ‘তথ্য ও ধারণার ক্ষেত্রে বড় ধাক্কা’ বলা হয়েছে, কারণ এই পর্যায়ে ইসলামাবাদ প্রচারযুদ্ধে এগিয়ে যায়।
কিন্তু এখানেই সংঘর্ষের মোড় ঘুরে যায়। রিপোর্টের মূল বক্তব্য, এই প্রাথমিক ধাক্কাই ভারতকে আরও সুসংগঠিত পাল্টা অভিযানে যেতে বাধ্য করে। পরবর্তী দিনগুলিতে ভারতীয় বায়ুসেনা পরিকল্পিত ভাবে পাকিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিষ্ক্রিয় করার অভিযান শুরু করে। SCALP-EG ও ব্রহ্মোসের মতো স্ট্যান্ড-অফ মিসাইল ব্যবহার করে, একাধিক দিক থেকে আঘাত হানা হয় রাডার ও সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল নেটওয়ার্কে।
এই প্রতিরক্ষাবলয় দুর্বল হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রধান প্রধান বিমানঘাঁটিতে একের পর এক নিখুঁত হামলা চালানো হয়। রানওয়ে, অবকাঠামো ও সহায়ক ব্যবস্থায় আঘাতের ফলে পাকিস্তানি বায়ুসেনার কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। আগের সংঘর্ষগুলির তুলনায় এবার সরাসরি আকাশশক্তির কেন্দ্রে আঘাতের মুখে পড়ে পাকিস্তান।
রিপোর্টে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভারতের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ও কমান্ড ব্যবস্থার উপর। IACCCS নেটওয়ার্ক, সেনাবাহিনীর ‘আকাশতীর’ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়, এবং আকাশ, বারাক-৮ ও এস-৪০০ - এই স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষা পাকিস্তানের পাল্টা হামলা কার্যত রুখে দেয়। সুইস বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা ছিল সংঘর্ষের অন্যতম বড় চমক।
১০ মে নাগাদ পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে যায়। পাকিস্তানের বিমানঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপে থাকায় তারা আর কার্যকরভাবে আকাশ দখলের লড়াই চালাতে সক্ষম ছিল না। অন্যদিকে, আকাশে কার্যত নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ভারত অভিযান কীভাবে চলবে, সেই শর্ত ঠিক করতে শুরু করে। এই অবস্থাতেই যুদ্ধবিরতির পথে যায় ইসলামাবাদ।
সামরিক সাফল্যের বাইরেও, রিপোর্টের মতে 'অপারেশন সিঁদুর' ভারতের কৌশলগত নীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ভবিষ্যতে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি হামলাকে আর বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা হিসেবে দেখা হবে না - বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। তার অর্থ, প্রতিক্রিয়া হবে আরও দ্রুত, বিস্তৃত ও প্রচণ্ড।
সব মিলিয়ে, প্রথম রাতের ক্ষণস্থায়ী সাফল্য সত্ত্বেও এই সংঘর্ষের শেষ কথা লিখেছে ভারত - এমনটাই বলছে এই স্বাধীন সুইস মূল্যায়ন।