সংবাদ সংস্থার এক তদন্তে উঠে এসেছে, দেশে তাপপ্রবাহ-জনিত মৃত্যুর হিসেব সংক্রান্ত তিনটি আলাদা, পুরনো এবং খণ্ডিত রিপোর্টিং সিস্টেম আছে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 9 June 2025 12:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতি বছরের মতো গত বছর মে মাসেও তীব্র দাবদাহে পুড়েছিল রাজধানী। এমন সময় একদিন দুপুরে দিল্লির গাজিপুর এলাকায় একজন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ও মাটিয়ে লুটিয়ে যান। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু ঠিক কী কারণে মৃত্যু তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। তীব্র গরমেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে মনে করা হলেও তার সাপেক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর পরিবার কোনও ক্ষতিপূরণও পায়নি।
শুধু তাই নয়। তাপপ্রবাহের কারণে মৃত্যুর যে সরকারি তালিকা তৈরি হয়, তাতে নাম ওঠেনি। ভারতের ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহে এমন অসংখ্য মৃত্যু হয়, যা অগোচরে থেকে যায়। ফলে সরকার যেমন সচেতন হতে পারছে না, তেমনই সঠিক নীতি নির্ধারণও ব্যাহত হচ্ছে।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর এক তদন্তে উঠে এসেছে, দেশে তাপপ্রবাহ-জনিত মৃত্যুর হিসেব সংক্রান্ত তিনটি আলাদা, পুরনো এবং খণ্ডিত রিপোর্টিং সিস্টেম আছে। এরা পরস্পর সাংঘর্ষিক তথ্য দেয়। ফলে প্রকৃত চিত্রও অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে।
এই তিনরকম রিপোর্ট ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (NCDC), ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB) ও মৌসম ভবন (IMD)দিয়ে থাকে। তথ্য বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এনসিডিসি-র রিপোর্ট অনুযায়ী তাপপ্রবাহের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩,৮১২ জনের। একই সময়ে এনসিআরবি জানিয়েছে ৮,১৭১ জনের মৃত্যু। অন্যদিকে আইএমডি-এর রিপোর্ট বলছে, ৩,৪৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কেন এত পার্থক্য?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বাস্থ্য মন্ত্রকের আধিকারিক জানিয়েছেন, 'এনসিডিসি-র তথ্য মূলত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা বা হাসপাতালে মৃত ব্যক্তিদের উপর নির্ভর করে। এনসিআরবি-র তথ্য আসে পুলিশি তদন্ত ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে। ফলে, দু’টি ডেটা সরাসরি তুলনীয় নয়।' আর মৌসম ভবন বেশিরভাগ সময় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে সংখ্যা দেয়। ফলে ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
আরও এক স্বাস্থ্যকর্তা বলেন, 'দেশের বহু রাজ্য যথাযথ রিপোর্ট পাঠায় না। অনেকে আবহাওয়া একটু ঠান্ডা হলে রিপোর্টিং বন্ধ করে দেয়।'
বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোতে কোনও আধুনিক ইলেকট্রনিক রেকর্ড সিস্টেম নেই। হাসপাতালগুলি এখনও ম্যানুয়ালি ডেটা এন্ট্রি করে। এর ফলে অনেক মৃত্যুর সঠিক তথ্য রেকর্ড হয় না বলেও জানা যাচ্ছে। এক কেন্দ্রীয় সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক প্রসঙ্গে বলেন, 'কখনও কখনও প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে সংখ্যা চেপে রাখে, যাতে ক্ষতিপূরণ দিতে না হয়।'
এই পরিস্থিতিতে মৃত্যু-সংক্রান্ত রিপোর্টিং সিস্টেম শক্তিশালী করা জরুরি বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রকের উপদেষ্টা সৌম্য স্বামীনাথন। এর একটাই কারণ, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা থাকলে নীতি নির্ধারণ আরও বাস্তবসম্মত হয়।
এনআরডিসি ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞ অভিয়ন্ত তিওয়ারির কথায়, 'বিশ্বজুড়ে তাপজনিত মৃত্যু সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয় না। কাজটা যথেষ্ট কঠিন। অনেক মৃত্যু হৃদরোগ বা অন্যান্য কারণে হয়। তাই, সাধারণ মৃত্যুর হার বিশ্লেষণ করা বেশি কার্যকর।'
কোথায় গলদ? গ্রিনপিস সাউথ এশিয়ার ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর অবিনাশ চঞ্চলের দাবি, ডিপার্টমেন্টগুলির মধ্যে তথ্যের ফারাক ও রিপোর্টিংয়ের দুর্বলতার ফলে প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তিনি এক্ষেত্রে সরকারের উদ্দেশে বলেন, তাদের বুঝতে হবে, সত্য গোপন করলে সমাধান আরও বিলম্বিত হবে।
তাহলে এখন কী করণীয়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি ভিত্তিতে এককভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি দফতর তৈরি করতে হবে, যা নির্ভরযোগ্য এবং সঠিক মৃত্যু-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও প্রকাশ করবে। না হলে, তীব্র তাপপ্রবাহে যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁরা শুধু এক অগোচরে থেকে যাবেন। এমন মৃত্যু আটকাতে প্রকৃত পদক্ষেপও করা হবে না কোনওদিন।