কেন্দ্র জানিয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক স্তরে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা, দ্রুত অব্যাহতি ও প্রত্যাবর্তনের জন্য সবরকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

শেষ আপডেট: 22 December 2025 13:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের (Russia Ukraine War) ভয়াবহতা যেন থামছেই না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। সেই তালিকায় ক্রমেই বাড়ছে ভারতীয়দের নামও। কেন্দ্রীয় সরকারের (MEA India) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োজিত ২০২ জন ভারতীয়র (Indians in Russian Army) মধ্যে এখনও অন্তত ৫০ জন সেখানে আটকে রয়েছেন। ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে ২৬ জনের (Russia Ukraine war Indian deaths)। নিখোঁজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে আরও সাত জনকে।
লোকসভায় সাংসদ সাকেত গোখলে ও রণদীপ সিং সুরজেওয়ালার প্রশ্নের উত্তরে এই তথ্য জানান বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং। তিনি জানান, সরকারের সম্মিলিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে এখন পর্যন্ত ১১৯ জন ভারতীয়কে রুশ সেনা থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেশে ফেরানো সম্ভব হয়েছে। বাকি ৫০ জনের দ্রুত মুক্তির জন্য এখনও চেষ্টা চালানো হচ্ছে (Indian nationals trapped in Russia)।
এই জবাব আসে ১৭ ডিসেম্বর, তার ঠিক এক দিন আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত দুই ভারতীয়র দেহ দিল্লি বিমানবন্দরে এসে পৌঁছয়।
কেন্দ্রের সতর্কতা, তবু থামেনি বিপদ
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই কেন্দ্রীয় সরকার ফের একবার ভারতীয়দের রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এলাকা থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করেছিল। কারণ, সেই সময় নতুন করে সামনে আসে এমন একাধিক অভিযোগ, যেখানে জানা যায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের যুবকরা প্রতারণার শিকার এবং এভাবেই তাঁদের রুশ সেনায় নিয়োগ করা হচ্ছে এবং পাঠানো হচ্ছে সরাসরি যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে।
এর আগেও একাধিকবার এই তথ্য সংসদে জানানো হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্র জানিয়েছিল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত ১২ জন ভারতীয়র মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ ছিলেন ১৬ জন। আবার ২০২৪ সালের অগস্টে বলা হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত আট জন ভারতীয় প্রাণ হারিয়েছেন।
যুদ্ধের পটভূমি
এই যুদ্ধ শুরু হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ইউক্রেন ন্যাটো, অর্থাৎ আমেরিকা ও ইউরোপীয় সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিতেই রাশিয়া তার প্রতিবেশী দেশের একাধিক অঞ্চলে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই থেকেই এখনও পর্যন্ত চলেছে এই সংঘর্ষ।
মৃতদেহ দেশে ফেরানো ও ডিএনএ শনাক্তকরণ
বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১০ জন মৃত ভারতীয় নাগরিকের দেহ দেশে ফেরাতে সাহায্য করেছে তারা। আরও দু’জনের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে শেষকৃত্যের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। যাঁদের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার খবর মিলেছে, এমন ১৮ জন ভারতীয়র পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা রুশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য।
মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, যাঁরা সেনা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, তাঁদের দেশে ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় ট্রাভেল ডকুমেন্ট, বিমান টিকিটের ব্যবস্থাও করেছে সরকার। পাশাপাশি, মৃতদেহ শনাক্তকরণ, নিকট আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাগজপত্র সম্পূর্ণ করা, ভারতে পাঠানো অথবা স্থানীয় দাহকার্যের কাজও করা হচ্ছে।
রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে ভারতীয় যুবকদের নিয়োগ: কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, জানাল কেন্দ্র
দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে টেনে নেওয়ার প্রবণতা শুরু হয় ২০২৩ সালের শুরু থেকেই। উচ্চ বেতনের লোভ, নানা সুবিধার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুবকদের লোভ দেখানো হয়। ভারতের বহু যুবক ছাত্র বা পর্যটক ভিসায় রাশিয়ায় যান। পরে তাঁদের বাধ্য করা হয় রুশ সেনায় যোগ দিতে। অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই বেতন দেওয়া হয় না এবং একবার ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হলে সেখান থেকে পালানোর সুযোগ কার্যত থাকে না।
যুদ্ধের শুরুতেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিদেশি স্বেচ্ছাসেবকদের রুশ সেনায় যোগ দেওয়ার একটি পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়েছিলেন। কোথাও কোথাও আবার ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের অভিযোগ উঠলে তাঁদের সামনে দুটি রাস্তা রাখা হয়েছে - হয় জেল, নয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো।
গুজরাট থেকে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন
গত অক্টোবরে গুজরাটের বাসিন্দা মাজোটি সাহিল মহাম্মদ হুসেনের ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন ফেলে। মাত্র তিন দিন ফ্রন্টলাইনে থাকার পর তিনি ইউক্রেনীয় সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর দাবি, স্টাডি ভিসায় রাশিয়ায় গিয়ে মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেফতার হন সাহিল। সাত বছরের কারাদণ্ড এড়াতে তিনি ‘স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন’-এ যোগ দিতে চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
ইউক্রেনের দিকেও ভারতীয়রা
ইউক্রেনের পক্ষেও ভারতীয়দের যোগ দেওয়ার খবর রয়েছে। যদিও সরকারি কোনও পরিসংখ্যান নেই, কিন্তু বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ১০০ জন ভারতীয় ইউক্রেনের ‘ইন্টারন্যাশনাল লিজিয়ন’-এ যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত দু’জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি। এই লিজিয়নটি গঠিত হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিদেশি সমর্থনের আহ্বানের পর। বর্তমানে ৫০টিরও বেশি দেশের স্বেচ্ছাসেবক এই বাহিনীতে রয়েছেন।
কাজের অভাব, দালালচক্র ও মৃত্যু
রাশিয়া ও ইউক্রেন, দু’দেশেই জনবলের ঘাটতি রয়েছে। সেই সুযোগেই বেকার যুবকদের টার্গেট করছে দালালচক্র। উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাবের মতো রাজ্যের তরুণদের ‘বিদেশে কাজ পাইয়ে দেওয়া’র নামে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রাজস্থানের ২২ বছরের অজয় গোদারা। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে স্টুডেন্ট ভিসায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি। অভিযোগ, জোর করে সেনায় নিয়োগ করা হয় তাঁকে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডনেটস্কের সেলিডোভে এলাকায় ড্রোন হামলায় মৃত্যু হয় তাঁর।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেরলের এক যুবক, যিনি রুশ সেনাবাহিনীর সাপোর্ট সার্ভিসে কাজ করতেন, তিনিও প্রাণ হারান। একইভাবে উত্তরাখণ্ডের রাকেশ কুমার মৌর্য (৩০) অগস্ট ২০২৫-এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডনবাসে যুদ্ধে নিহত হন তিনি।
পরিবারের দাবি - বিচার চাই
একদিকে কূটনৈতিক স্তরে ভারত সরকার চেষ্টা চালালেও, অন্যদিকে নিহত ও আটকে থাকা যুবকদের পরিবার ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছেন। কেন্দ্র জানিয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক স্তরে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা, দ্রুত অব্যাহতি ও প্রত্যাবর্তনের জন্য সবরকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে।