ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণার সম্ভাবনা আজ। এই চুক্তি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত–ইইউ সম্পর্ককে নতুন দিশা দিতে পারে।

ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তি
শেষ আপডেট: 27 January 2026 07:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঐতিহাসিক, ‘মেগা’ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement বা FTA) ঘোষণার পথে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union)। দুই পক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে কেবল বাণিজ্য নয়—ভারত-ইইউ সম্পর্কের সামগ্রিক চরিত্রেই আসতে চলেছে বিশাল পরিবর্তন। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) নীতিগত সিদ্ধান্তে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার আবহে, এই অংশীদারিত্ব নতুন কৌশলগত দিশা দেখাবে বলে মত কূটনৈতিক মহলের।
আজ অর্থাৎ মঙ্গলবার হতে চলেছে বৈঠক। যার মূল আলোচ্য বিষয়—বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা (Defence and Security), জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change), গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি (Critical Technologies) এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে (Rules-based Global Order) আরও মজবুত করা। এই বৈঠক থেকেই একটি বিস্তৃত কৌশলগত ভিশন প্রকাশ্যে আসার কথা।
আজ দিল্লিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন (Ursula von der Leyen) এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তা (Antonio Costa)-র সঙ্গে দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সূত্রের খবর, এরপরই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কোস্তা ও ভন ডার লেয়েন এবছর সাধারণতন্ত্র দিবসের (Republic Day) অতিথি, যোগ দেন কুচকাওয়াজে কর্তব্য পথে (Kartavya Path)।
কী বলছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরফে জানানো হয়েছে, এই নতুন অংশীদারিত্বের মধ্যে থাকছে একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো চুক্তি (Defence Framework Pact) এবং একটি কৌশলগত কর্মসূচি (Strategic Agenda)। এমন এক সময়ে এই চুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে, যখন ইউরোপ ধীরে ধীরে আমেরিকা ও চিনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে।
গত সপ্তাহেই উরসুলা ভন ডার লেয়েন মন্তব্য করেছিলেন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একেবারে ‘ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি’র দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। তাঁর কথায়, এই চুক্তি কার্যকর হলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজার তৈরি হবে, যা বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের (Global GDP) প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান।
প্রসঙ্গত, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০০৪ সাল থেকে কৌশলগত অংশীদার (Strategic Partners)। আজ যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব (Security and Defence Partnership) ঘোষণা হওয়ার কথা, তার মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আরও গভীর সহযোগিতা গড়ে উঠবে। বিশেষ করে ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ (Interoperability) বা যৌথভাবে কাজ করার সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি, ভারতীয় সংস্থাগুলির জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘সেফ’ কর্মসূচিতে (SAFE) অংশ নেওয়ার দরজা খুলে যাবে। এই ‘সেফ’ হল ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫০ বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক প্রকল্প, যার লক্ষ্য সদস্য দেশগুলির প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি দ্রুত জোরদার করা।
এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঘাটতির কারণে ২০১৩ সালে সেই আলোচনা থমকে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালের জুন মাসে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। আজকের বৈঠক সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বলে মনে করা হচ্ছে।
শীর্ষ বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফল হতে পারে ভারতীয় কর্মীদের ইউরোপে যাতায়াত সহজ করার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (Memorandum of Understanding on Mobility)। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলি ভারতের সঙ্গে শ্রমিক ও পেশাদারদের চলাচল সংক্রান্ত উদ্যোগ আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। ইতিমধ্যেই ফ্রান্স (France), জার্মানি (Germany) ও ইতালি (Italy)-র সঙ্গে ভারতের মাইগ্রেশন ও মোবিলিটি অংশীদারিত্ব রয়েছে।
কূটনীতিকদের ধারণা, বৈঠকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ (Russia-Ukraine War)-সহ একাধিক বৈশ্বিক সঙ্কট নিয়েও আলোচনা হতে পারে। যদিও সব বিষয়ে দুই পক্ষের মত এক নয়, তবু একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উভয়েরই মৌলিক স্বার্থ এক জায়গায় মিলছে।
এদিকে, গত কয়েক বছরে ভারত–ইইউ সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য ভাবে ঊর্ধ্বমুখী। পণ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন ভারতের সবচেয়ে বড় অংশীদার। ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ভারতের রপ্তানি প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার।