বলা হয় ওই দিনই বাংলাদেশের বিজয়ের সূচনা হয়ে গিয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয় অর্থাৎ পাক সেনার সঙ্গে যুদ্ধে বিজয় এসেছিল আরো দশ দিন পর ১৬ ডিসেম্বর।

ছবি-সংগৃহীত।
শেষ আপডেট: 6 December 2025 10:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত ও বাংলাদেশের জন্য ৬ ডিসেম্বর দিনটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের এই দিনে ভারত সরকার প্রথম বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সংসদে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। বলা হয় ওই দিনই বাংলাদেশের বিজয়ের সূচনা হয়ে গিয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয় অর্থাৎ পাক সেনার সঙ্গে যুদ্ধে বিজয় এসেছিল আরো দশ দিন পর ১৬ ডিসেম্বর।
তবে বিগত কয়েক বছরের মতো এবার ৬ ডিসেম্বরে ভারত ও বাংলাদেশ সরকার দিনটি মৈত্রী দিবস হিসেবে পালন করছে না। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এই দিনটি মৈত্রী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বিএনপি'র কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান তারেক জিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে অবশ্য এই দিনটিকে ঐতিহাসিক বলেছেন। ১৯৯০ এ স্বৈরশাসক হুসেন মোহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল এই দিনে। গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করেছিলেন এরশাদ। তারেক অবশ্য এই আন্দোলনের পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন তাঁর মা খালেদা জিয়াকে। ওই আন্দোলনে একসঙ্গে রাজপথে ছিলেন খালেদা এবং আওয়ামী লিগ নেত্রী শেখ হাসিনা।
২০২১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঢাকা গিয়েছিলেন। সেই সময় দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা করা হয় ৬ ডিসেম্বর মৈত্রী দিবস হিসেবে পালন করবে দুই দেশ। সেই থেকে দিনটি মৈত্রী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল।
কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ৬ ডিসেম্বর আলাদা করে উদযাপন করছে না বাংলাদেশ। ভারত সরকারও তাই কোন উৎসাহ দেখায়নি। নয়াদিল্লির কর্তাদের বক্তব্য মৈত্রী দিবস পালনের প্রস্তাবটি এসেছিল বাংলাদেশের তরফে।

১৯৭১ এর ৪ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি লিখে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার আর্জি জানিয়েছিলেন। পরদিন পাঁচ ডিসেম্বরই শ্রীমতি গান্ধী বাংলাদেশি নেতাদের আরজি বিবেচনার আশ্বাস দেন। পরদিন সংসদে ঘোষণা করেন বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারত স্বীকৃতি দিল।
প্রসঙ্গত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় সেনা লড়াইয়ে সম্পৃক্ত থাকলেও পাকিস্তানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তিন ডিসেম্বর। ওইদিন বিকালে পাকিস্তান জম্মু-কাশ্মীর উত্তরপ্রদেশ পাঞ্জাব সহ উত্তর ভারতের বেশ কিছু এলাকায় ভারতীয় বিমান ঘাঁটিতে বোমা ফেলে।
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেদিন ছিলেন কলকাতায়। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় তাঁর কাছে পা হামলার খবর আসে। তাঁর দ্রুত দিল্লি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে গিয়ে যথেষ্ট ঝুঁকি নিতে হয়েছিল ভারতীয় বায়ু সেনাকে। পাকিস্তানের হামলা এড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে কিভাবে কলকাতা থেকে দিল্লি নিয়ে যাওয়া হবে, তাই নিয়ে চিন্তায় পড়েন সেনা কর্তারা। তবে একটা সুবিধা ছিল, পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ থেকে হামলার তেমন একটা আশঙ্কা ছিল না এই প্রান্তে পাকিস্তান বিমান বাহিনী তেমন শক্তিশালী না থাকায়। প্রধানমন্ত্রীর বিমানকে দুটি যুদ্ধবিমান পাহারা দিয়ে দিল্লি পৌঁছে দেয় সেদিন।
৬ ডিসেম্বর সকালে ইন্দিরা গান্ধী সংসদে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা মাত্র গোটা পৃথিবী জুড়ে সাড়া পড়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান তথা স্বাধীনতা ঘোষণাকারী বাংলাদেশের মানুষও সেদিন থেকেই স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন। ভারতের ঘোষণার পর একাধিক দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশের নয় মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে ৬ ডিসেম্বর ছিল এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন, যা পাকিস্তানের পরাজয়কে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেছিল। ভারতের স্বীকৃতির পর পরবর্তী ১০ দিন পাকিস্তানি সেনা ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করে এবং তাদের মনবল ভেঙে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রমনা ময়দানে আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করেন পাক সেনা নায়ক জেনারেল নিয়াজি।
২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ তম বর্ষ দু' দেশেই মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়। ৬ ডিসেম্বরকে আলাদা করে প্রতিবছর পালনের প্রস্তাব দেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর ভাবনা ছিল মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকাকে স্মরণ একটি দিন উদযাপন করা। সেইমতো বাংলাদেশে এবং সে দেশের বিদেশি মিশন গুলিতে হাসিনার জমানায় ছয় ডিসেম্বর বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়েছে। আলোচনা সভায় ভারত সরকার এবং ভারতের জনগণ ও সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
তবে হাসিনা জমানার অবসানের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মহম্মদ ইউনুস সরকার সে দেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের মতো অনুষ্ঠানে ভারতের নাম উচ্চারণ করছেন না। গত মাসে ঢাকা সেনানিবাসে সেনা
দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কৃতিত্ব নিয়ে একাধিক বক্তা ভাষণ দেন। কিন্তু একজনও মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যোগদান এবং আত্ম বলিদানের উল্লেখ করেননি। অবশ্য মহম্মদ ইউনুস গুরুত্বপূর্ণ ওই দিনটিতে নয়া বিতর্ক তৈরি করেছেন বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করে। দেশি-বিদেশি নথিপত্র যদিও বলে, স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত তারবার্তাই পাট করেছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।