ভারতীয় মুদ্রার এখন ‘ফ্রি ফল’ হচ্ছে! প্রথমবারের মতো মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৯৩-এর গণ্ডি পেরিয়ে প্রায় ৯৪ ছুঁয়ে ফেলেছে। শুক্রবার এক লাফে ১ শতাংশেরও বেশি পড়ে ৯৩.৭৩৫০-এ পৌঁছয় রুপি, পরে দিনশেষে ৯৩.৭১-এ স্থির হয়। গোটা সপ্তাহে প্রায় ১.৩ শতাংশ পতন ঘটে। পতনের এই হার চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, তবে যে জায়গায় ভারতীয় টাকা পৌঁছে গেছে তা ঐতিহাসিক পতন।

শেষ আপডেট: 22 March 2026 17:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় মুদ্রার এখন ‘ফ্রি ফল’ হচ্ছে! প্রথমবারের মতো মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৯৩-এর গণ্ডি পেরিয়ে প্রায় ৯৪ ছুঁয়ে ফেলেছে। শুক্রবার এক লাফে ১ শতাংশেরও বেশি পড়ে ৯৩.৭৩৫০-এ পৌঁছয় রুপি, পরে দিনশেষে ৯৩.৭১-এ স্থির হয়। গোটা সপ্তাহে প্রায় ১.৩ শতাংশ পতন ঘটে। পতনের এই হার চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, তবে যে জায়গায় ভারতীয় টাকা পৌঁছে গেছে তা ঐতিহাসিক পতন।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে গেছে। ভারত যেহেতু মোট চাহিদার প্রায় ৮৫–৮৮ শতাংশ তেল আমদানি করে, তাই তেলের দাম বাড়লেই ডলারের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে আমদানিকারকদের ডলার কেনার চাপ সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে টাকার উপর। আর যত চাপ ফেলছে ততই পড়ছে টাকার দাম।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা—যা বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। এই পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি নয়, সার, বিমান পরিবহণ, রাসায়নিক শিল্প—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সঙ্কটের নেপথ্যে নাটের গুরু তথা শনি ঠাকুর হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি। ইরানকে ঘিরে মার্কিন অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর ফলে বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা চরমে উঠেছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলিতে—যেমন ভারত। ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া অবস্থান শুধু জ্বালানি বাজারকেই অস্থির করেনি, বরং বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ‘রিস্ক-অফ’ মনোভাব তৈরি করেছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (FII) ভারতীয় বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নিচ্ছেন। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছেন।
আবার মার্কিন ডলার সূচকও (Dollar Index) দ্রুত শক্তিশালী হয়েছে। ৯৫.৫ থেকে বেড়ে ১০০-এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাগুলিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের কড়া সুদের নীতি এবং সুদ কমানোর সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা আরও বেড়েছে।
তবে অনেকের মতে, শুধু আন্তর্জাতিক কারণ নয়, টাকা দুর্বল হওয়ার নেপথ্যে ঘরোয়া কারণও রয়েছে। ভারতীয় শেয়ার বাজারে প্রায় ১৩% সংশোধন হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে, তার ফলে শুরু হয়েছে পুঁজির বহির্মুখী প্রবাহ। এই সব মিলিয়েই টাকার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অবশ্য বাজারে হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন বৈশ্বিক কারণ এত শক্তিশালী, তখন শুধুমাত্র আরবিআইয়ের পদক্ষেপে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি আনা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব শীঘ্রই টাকা ৯৪.৮০–৯৫ স্তরে পৌঁছতে পারে। যদি ৯৫-এর উপরে স্থায়ীভাবে উঠে যায়, তবে তা ৯৭–৯৮ এমনকি ১০০-এর দিকেও এগোতে পারে—যা ভারতীয় অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা।
এখন কৌতূহলের বিষয় হল, ডলারের বিনিময়ে টাকা কি ১০০ ছুঁয়ে ফেলে তার প্রভাব কী পড়ে পারে ঘরোয়া অর্থনীতিতে?
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকা যদি ১০০ ছুঁয়ে ফেলে, তাহলে সেটি শুধু একটি মনস্তাত্ত্বিক স্তর অতিক্রম করা নয়—বরং অর্থনীতির একাধিক স্তরে তার গভীর প্রভাব পড়বে।
১. জ্বালানি ও দৈনন্দিন খরচ বাড়বে। ভারত তার তেলের চাহিদার ৮৫% এর বেশি আমদানি করে। টাকা দুর্বল হলে একই পরিমাণ তেল কিনতে বেশি ডলার খরচ করতে হবে। ফলে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়বে। রান্নার গ্যাসের দাম বাড়তে পারে। পরিবহণ খরচ বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের পকেটে।
২. মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বাড়বে। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে। নির্মাণ খরচ বাড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ফলে সামগ্রিকভাবে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, যা RBI-র জন্য বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়াবে।
৩. আমদানি ব্যয় বাড়বে, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট বাড়বে। ডলার শক্তিশালী হলে সব আমদানিই (যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স, সার, কেমিক্যাল) বেশি খরচসাপেক্ষ হয়ে যায়। ফলে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট (CAD) বাড়বে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য খারাপ হবে।
৪. বিদেশি বিনিয়োগ কমতে পারে। টাকা দুর্বল হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি বেশি মনে করেন। বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (FII) টাকা তুলে নিতে পারে। শেয়ার বাজারে পতন হতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
৫. EMI ও সুদের হারে প্রভাব পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে RBI সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। ফলে গৃহঋণ, গাড়ির লোনের EMI বাড়তে পারে। কর্পোরেট ঋণের খরচ বাড়বে।
৬. কর্পোরেট সেক্টরে চাপ পড়তে পারে। যেসব কোম্পানি বিদেশ থেকে কাঁচামাল আনে বা ডলারে ঋণ নিয়েছে, তাদের খরচ বেড়ে যাবে। লাভ কমবে। কিছু ক্ষেত্রে তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হবে।
৭. তবে কিছু লাভও হতে পারে। সবটাই খারাপ নয়। আইটি ও এক্সপোর্ট সেক্টর লাভবান হবে (কারণ তারা ডলারে আয় করে)। রেমিট্যান্স (বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো) বাড়তে পারে।
ডিসক্লেমার: এই বিশ্লেষণটি তথ্যভিত্তিক ও সাধারণ অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা। এটি কোনও বিনিয়োগ পরামর্শ নয়। ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।