প্রশ্ন উঠছে, যদি ওই অঞ্চলই পেট্রল ও ডিজেলের উৎস হয়ে থাকে, তাহলে প্রথম ধাক্কাটা এলপিজি সরবরাহেই কেন লাগল? কেন দেশের পাম্পগুলোতে এখনও পেট্রল-ডিজেলের সরবরাহ তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক? ভবিষ্যতে কি এখানেও কোপ পড়তে পারে?

পেট্রল-ডিজেলের সরবরাহেও কি ভবিষ্যতে কোপ পড়তে পারে?
শেষ আপডেট: 14 March 2026 16:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরব দুনিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ভারতে এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্পষ্ট চাপ (India LPG shortage) দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির নেপথ্যে পারস্য উপসাগরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ - হরমুজ প্রণালী (Hormuz crisis LPG supply India)। আমেরিকা ও ইজরায়েলের ইরানের ওপর হামলা এবং তার জবাবে তেহরানের পাল্টা পদক্ষেপের ফলে সবচেয়ে আগে কোপ এসে পড়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে, জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অথচ এই অঞ্চলই বিশ্বের অন্যতম বড় জীবাশ্ম জ্বালানি রফতানিকারক এলাকা, যেখান থেকে ভারতও বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যদি ওই অঞ্চলই পেট্রল ও ডিজেলের উৎস হয়ে থাকে, তাহলে প্রথম ধাক্কাটা এলপিজি সরবরাহেই কেন লাগল? কেন দেশের পাম্পগুলোতে এখনও পেট্রল-ডিজেলের সরবরাহ (petrol diesel supply India) তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক? ভবিষ্যতে কি এখানেও কোপ পড়তে পারে?
আতঙ্ক বাড়ছে, কিন্তু সরকার বলছে সরবরাহ যথেষ্ট
গত ৯ মার্চ থেকে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে মানুষের উদ্বেগ দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। ১২ মার্চের পর থেকে কিছু জায়গায় সিএনজি, ডিজেল এবং পেট্রল পাম্পেও ভিড় দেখা যাচ্ছে, যদিও তা খুব বেশি নয়।
কেন্দ্র সরকার অবশ্য বারবার জানিয়েছে যে, পেট্রল ও ডিজেল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পেট্রোলিয়াম জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। এলপিজির ক্ষেত্রেও গৃহস্থালির সরবরাহে কোনও ব্যাঘাত ঘটবে না বলেই আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
রাস্তার দীর্ঘ লাইন, গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে ধস্তাধস্তি কিংবা সরবরাহে দেরিকে কেন্দ্র সরকার “চাহিদা-চালিত বিকৃতি” বলে ব্যাখ্যা করেছে। তবে গৃহস্থালির গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দিতে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে কালোবাজারে সিলিন্ডারের দাম বেড়ে গেছে, এবং অনেক ছোট রেস্তরাঁ ও ধাবা আপাতত ব্যবসা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
হরমুজ প্রণালীর এই সংকট তাই প্রথম ধাক্কা দিয়েছে এলপিজি সরবরাহে। ফলে দেশের রান্নাঘরেই তার প্রভাব সবচেয়ে আগে দেখা গেছে, পেট্রল পাম্প বা ব্যক্তিগত গাড়িতে নয়।
ভারতের এলপিজি সরবরাহে হরমুজের গুরুত্ব
ভারতে বছরে ৩১ মিলিয়ন টনেরও বেশি এলপিজি ব্যবহার হয়, এমনটাই বলছে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তথ্য। কিন্তু দেশের নিজস্ব উৎপাদন সেই চাহিদার অর্ধেকেরও কম পূরণ করতে পারে। বাকি অংশ আমদানি করতে হয় সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে।
এই এলপিজি বোঝাই ট্যাঙ্কারগুলোকে ভারতে পৌঁছতে হলে হরমুজ প্রণালী দিয়েই আসতে হয়। বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, ভারতে আসা প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ এলপিজি কার্গো এই পথ দিয়েই আসে।
অন্যদিকে পেট্রল ও ডিজেলের উৎস যে অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল, তার সরবরাহ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।
ক্রুড অয়েল আমদানির উৎস অনেক বেশি বিস্তৃত
ভারত বর্তমানে ৪০টিরও বেশি দেশ থেকে ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ভারতের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। তার পরে রয়েছে ইরাক ও সৌদি আরব।
রাশিয়া থেকে আসা ক্রুড অয়েলের বড় অংশ এমন সমুদ্রপথ দিয়ে ভারতে পৌঁছয়, যেখানে হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করতে হয় না। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির মতে, ভারতের মোট ক্রুড অয়েল আমদানির প্রায় ৭০ শতাংশ এখন হরমুজ প্রণালীর বাইরে থাকা উৎস থেকে আসে।
সম্প্রতি আমেরিকা ৩০ দিনের একটি ছাড় দেওয়ার পর সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার প্রায় ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল ক্রুড অয়েল ভারত কিনেছে বলে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে।
ভারতে পৌঁছনোর পর এই অপরিশোধিত তেল রিফাইনারিগুলিতে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পেট্রল, ডিজেল এবং অন্যান্য জ্বালানিতে পরিণত হয়। দেশের রিফাইনিং ক্ষমতাও অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন হলেও উৎপাদন সমন্বয় করার সুযোগ থাকে।
কৌশলগত মজুতও বড় কারণ
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল কৌশলগত মজুত। ক্রুড অয়েলের ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ রয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিশাখাপত্তনম, মেঙ্গালুরু এবং পাদুরে ভূগর্ভস্থ শিলা গুহায় ক্রুড অয়েল মজুত রাখা হয়। রিফাইনারি ও তেল বিপণন সংস্থাগুলির বাণিজ্যিক মজুতের সঙ্গে মিলিয়ে এই ভাণ্ডার কয়েক সপ্তাহের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারে। এই কারণেই পেট্রল ও ডিজেলের সরবরাহে তাৎক্ষণিক সংকট দেখা যায় না।
এলপিজি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন?
এলপিজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। ক্রুড অয়েলের মতো এলপিজির বড় কৌশলগত মজুত ভারতে নেই।
মেঙ্গালুরু ও বিশাখাপত্তনমে এলপিজি সংরক্ষণের জন্য কিছু ব্যবস্থা থাকলেও মোট মজুত মাত্র ১.৪ লাখ টন। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA)-র হিসাব অনুযায়ী, এটি ভারতের দুই দিনেরও কম ব্যবহারের সমান।
ভারতের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা মূলত ধারাবাহিক প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল, দীর্ঘমেয়াদি মজুতের ওপর নয়। IEA-র ‘ইন্ডিয়া গ্যাস মার্কেট রিপোর্ট - আউটলুক টু ২০৩০’ অনুযায়ী দেশে এখনও ভূগর্ভস্থ গ্যাস সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই এবং এলএনজি মজুতের ক্ষমতাও সীমিত, প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ঘনমিটার।
ভবিষ্যতে কৌশলগত গ্যাস ভাণ্ডার তৈরির প্রস্তাব থাকলেও তা এখনও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। IEA-র ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির রিপোর্ট বলছে, প্রায় ৪ বিলিয়ন ঘনমিটার ক্ষমতার একটি ভূগর্ভস্থ গ্যাস ভাণ্ডার তৈরি করতে ১-২ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে এবং অনুমোদনের পর নির্মাণে ৩-৪ বছর সময় লাগতে পারে।
এলপিজির চাহিদাও গত দশকে দ্রুত বেড়েছে
এলপিজির ওপর ভারতের নির্ভরতা গত দশকে অনেক বেড়েছে। কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার ফলে গ্রামাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ পরিবার রান্নার গ্যাসের আওতায় এসেছে।
২০১০ সালে দেশে এলপিজি সংযোগ ছিল প্রায় ১০.৬ কোটি। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪.৫ কোটিতে। ২০১৮ সালে তা ছিল ২২.৪ কোটি। ২০২৫ সালে এসে তা প্রায় ৩৩ কোটিতে পৌঁছেছে বলে পেট্রোলিয়াম প্ল্যানিং অ্যান্ড অ্যানালিসিস সেলের তথ্য।
জ্বালানি কাঠ ও বায়োমাস থেকে এলপিজিতে এই পরিবর্তন জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও এর ফলে দেশের রান্নাঘর এখন ক্রমাগত এলপিজি সরবরাহের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সংকট সামলাতে কী করছে সরকার?
এলপিজি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্র সরকার ও গ্যাস সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে।
রিফাইনারিগুলিকে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের সময় যত বেশি সম্ভব এলপিজি পুনরুদ্ধার করতে বলা হয়েছে। প্রোপেন ও বিউটেনের মতো কিছু পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামালও সাময়িকভাবে রান্নার গ্যাস উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে, যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম আফ্রিকা, থেকে অতিরিক্ত এলপিজি আমদানির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে সেই জাহাজ ভারতে পৌঁছতে বেশি সময় লাগতে পারে এবং খরচও বেশি হতে পারে। তাই আপাতত গৃহস্থালির চাহিদাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বৈশ্বিক রাজনীতি থেকে সরাসরি প্রভাব ভারতীয় রান্নাঘরে
সরকারের দাবি অনুযায়ী পেট্রল ও ডিজেলের পাম্পে এখনও পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু গ্যাস এজেন্সির সামনে দীর্ঘ লাইন দেখিয়ে দিচ্ছে, দূরের সমুদ্রপথে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কত দ্রুত ভারতের ঘরে ঘরে পৌঁছে যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালীতে জট তৈরি হতেই এলপিজি সরবরাহে আগে ধাক্কা লাগার কারণ তাই স্পষ্ট - ভারত কীভাবে বিভিন্ন জ্বালানি আমদানি করে, কীভাবে সেগুলি সংরক্ষণ করে এবং গত এক দশকে এলপিজির ওপর নির্ভরতা কতটা বেড়েছে, এই সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সেই উত্তর।