কেবল ‘উপার্জনের সম্ভাবনা’ (earning capacity) দেখিয়ে স্বামীর আইনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

কল্পিত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি। কোনও ব্যক্তি বা চরিত্রের সঙ্গে মিল থাকলে তার জন্য দ্য ওয়াল দায়ী নয়।
শেষ আপডেট: 12 January 2026 13:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দাম্পত্য বিরোধে স্ত্রীর সামাজিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে এলাহাবাদ হাইকোর্ট (Allahabad High Court) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— স্ত্রীর উচ্চশিক্ষাগত যোগ্যতা বা কারিগরি দক্ষতা (wife educational qualification) ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় (Section 125 CrPC – maintenance law) ভরণপোষণে (maintenance) বঞ্চনার কোনও বৈধ কারণ হতে পারে না।
বিচারপতি গরিমা প্রসাদ (Justice Garima Prashad) গত ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে সুমন বর্মা ও অন্য একজন বনাম উত্তরপ্রদেশ সরকার ও অন্য একজনের মামলায় (Suman Verma vs State of UP, 2026 LiveLaw (AB) 17) এই রায় দেন। তিনি বুলন্দশহরের গার্হস্থ্য আদালতের নির্দেশ খারিজ করেন, যেখানে শুধুমাত্র স্ত্রীর শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে ভরণপোষণ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। বিষয়টি নতুন করে বিচার করার জন্য নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠানো হয় (remand for fresh consideration)।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, বহু বছর সংসার ও গৃহস্থালির দায়িত্ব পালনের পর শিক্ষিত নারীদের কর্মক্ষেত্রে পুনরায় ফিরে যাওয়া বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন। ফলে কেবল ‘উপার্জনের সম্ভাবনা’ (earning capacity) দেখিয়ে স্বামীর আইনি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এই রায় সামাজিক ন্যায়ের উদ্দেশ্যকে (social justice under CrPC) আরও দৃঢ় করল— যার লক্ষ্য স্বামীর আয়ের উপর নির্ভরশীল স্ত্রী ও সন্তানদের অনাহার ও দারিদ্র্য থেকে রক্ষা করা। আদালত একই সঙ্গে নাবালক ছেলের জন্য মাসে মাত্র ৩,০০০ টাকা ভরণপোষণ ধার্য করায় পারিবারিক আদালতের তীব্র সমালোচনা করে। বিচারপতির মতে, একজন কিশোরের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য এই অঙ্ক অত্যন্ত কম।
সুমন বর্মা (Suman Verma) ও তাঁর স্বামীর বিয়ে হয় ২০ মে, ২০০৬ সালে, হিন্দু রীতি অনুযায়ী (Hindu rites and rituals)। তাঁদের একমাত্র সন্তান মাস্টার তিলক বর্মা (Tilak Verma), বর্তমানে আনুমানিক ১৫ বছর বয়সি, মায়ের সঙ্গেই থাকেন। সুমনের অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই তাঁর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন (cruelty) শুরু হয়, সঙ্গে পণের দাবিতে (dowry demand) লাগাতার হেনস্তা চলতে থাকে। ২০১৫ সালে প্রথমবার তাঁকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। তখন তিনি ভরণপোষণের মামলা করেন, যা ৭ নভেম্বর ২০১৫-তে আপসের ভিত্তিতে মিটে যায়। স্বামী ভালো ব্যবহারের আশ্বাস দিলে তিনি সংসারে ফেরেন।
কিন্তু সেই আশ্বাস রক্ষা হয়নি। ফের নির্যাতনের অভিযোগ তুলে সুমন জানান, ৯ জানুয়ারি ২০২০-তে তাঁকে ও তাঁর ছেলেকে আবার বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তারপর থেকে তিনি বাপের বাড়িতে থাকছেন। এর পর ১৯ এপ্রিল ২০২১-এ তিনি নতুন করে ভরণপোষণের আবেদন করেন। নিজের জন্য মাসে ১৫,০০০ টাকা এবং ছেলের জন্য ১০,০০০ টাকা দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁর নিজস্ব কোনও আয় নেই। অন্যদিকে স্বামী বুলন্দশহরের একটি প্রাথমিক স্কুলে (primary school) চতুর্থ শ্রেণির কর্মী (Class-IV employee) হিসেবে কাজ করেন এবং তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৩৫,০০০–৪৮,০০০ টাকা।
৩ অক্টোবর ২০২৪-এ বুলন্দশহরের গার্হস্থ্য হিংসা আদালতের অতিরিক্ত প্রধান বিচারক (Additional Principal Judge, Family Court) সুমনের আবেদন খারিজ করে দেন। আদালতের যুক্তি ছিল—
তবে ছেলের বৈধতা (legitimacy of child) স্বীকার করে আদালত মাসে ৩,০০০ টাকা ভরণপোষণ মঞ্জুর করে। স্বামীর পে স্লিপ অনুযায়ী মোট বেতন ছিল তখন ৪৮,৩৫০ টাকা, কিন্তু ঋণ কেটে মোট আয় দেখানো হয় মাত্র ১৩,২২৬ টাকা। এই নির্দেশের বিরুদ্ধেই সুমন ও তাঁর ছেলে মামলা দায়ের করেন। শুনানি হয় ৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ এবং রায় ঘোষণা হয় ৮ জানুয়ারি ২০২৬-এ।
বিচারপতি গরিমা প্রসাদ পারিবারিক আদালতের যুক্তিগুলি একে একে খারিজ করেন। স্ত্রীর যোগ্যতা প্রসঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, উপার্জনের সম্ভাবনা আর প্রকৃত আয় এক জিনিস নয়। এমএ বা আইটিআই ডিপ্লোমা থাকলেই যে স্ত্রী রোজগার করছেন বা করতে পারবেন, এমন ধরে নেওয়া যায় না।
এই প্রসঙ্গে আগের কয়েকটি মামলার রায় উদ্ধৃত করে বলা হয়, ভরণপোষণের অর্থ কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন (life with dignity)। নাবালক সন্তানের ক্ষেত্রে আদালত আগের একটি মামলার নির্দেশিকা মনে করিয়ে দেয়। সাধারণত বাবার মোট আয়ের অন্তত ২৫ শতাংশ সন্তানের ভরণপোষণে ধরা উচিত। সেই তুলনায় ৩,০০০ টাকা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট সম্পূর্ণভাবে পারিবারিক আদালতের নির্দেশ বাতিল করে। এবং স্ত্রী ও সন্তান, উভয়েই ভরণপোষণের অধিকারী বলে ঘোষণা করা হয়। মামলাটি এক মাসের মধ্যে নতুন করে বিচার করার জন্য বুলন্দশহরের নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। স্বামীর মোট আয় বিবেচনায় নিয়ে, অযথা ঋণের যুক্তি উপেক্ষা করে সামাজিক ন্যায়ের উদ্দেশ্য মেনে নতুন অঙ্ক ধার্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই রায় ভবিষ্যতের বহু মামলায় দৃষ্টান্ত (precedent) হয়ে থাকবে। শুধু ডিগ্রি বা প্রশিক্ষণের অজুহাতে স্ত্রীর ভরণপোষণ অস্বীকার করার প্রবণতায় কার্যত রাশ টানল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আবারও মনে করিয়ে দিল, ভরণপোষণ কোনও দান নয়, বরং আইনি অধিকার।