একসময়ের মাওবাদী গড় গড়চিরৌলিতে এখন গড়ে উঠছে লৌহ আকরিক শিল্প, হাসপাতাল, স্কুল ও সিনেমা হল। বদলে যাচ্ছে জনজীবন, দৃঢ় হচ্ছে নিরাপত্তা।

লাল সন্ত্রাস পেরিয়ে উন্নয়নের পথে গড়চিরৌলি।
শেষ আপডেট: 22 July 2025 10:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একসময়ের মাওবাদী গড় গড়চিরৌলি আজ পাল্টে যাচ্ছে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে। কয়েক বছর আগেও যেখানে ছেয়ে থাকত রাইফেলের আওয়াজ, আজ সেখানে শোনা যায় লৌহ আকরিক শোধনাগারের নির্মাণশিল্পের গর্জন।
শুধু তাই নয়, মহারাষ্ট্রের এই অভিশপ্ত লাল করিডোরে আজ দাঁড়িয়েছে আধুনিক হাসপাতাল, একটি নতুন স্কুল, এমনকি তৈরি হয়েছে একটি সিনেমা হলও। বদলাচ্ছে পরিকাঠামো, দৃঢ় হচ্ছে নিরাপত্তা, আর তার সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবনও।
মাত্র এক দশক আগে, পূর্ব মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ অঞ্চলের চন্দ্রপুর ও বল্লারপুর স্টেশনে ট্রেন থামলেও যাত্রীরা কোচের দরজা খুলতেন না। প্ল্যাটফর্মগুলো ছিল জনমানবহীন, দোকানপাট ছিল না বললেই চলে। কারণ চন্দ্রপুর ও তার লাগোয়া গড়চিরৌলি জেলা মাওবাদী সন্ত্রাসে কাঁপত।
১৯৮২ সালে চন্দ্রপুর জেলার বিভাজন থেকে তৈরি হয় এই মাওবাদী ঘাঁটি, গড়চিরৌলি। চন্দ্রপুরে ১৯৭০-এর দশক থেকেই শিল্পের ছোঁয়া লাগলেও (কয়লাখনি, ফেরো অ্যালয় প্ল্যান্ট, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র), গড়চিরৌলি পিছিয়ে পড়ে বনজ সম্পদ ও কৃষিনির্ভরতায়।
পরবর্তীকালে চন্দ্রপুরের উন্নয়নের ঢেউ এসে পৌঁছয় গড়চিরৌলিতেও। তার জেরেই মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীস গড়চিরৌলির হেডরিতে উদ্বোধন করলেন একটি ৫ মিলিয়ন টন পার অ্যানাম (MTPA) লৌহ আকরিক শোধনাগার ও ১০ MTPA স্লারি পাইপলাইন প্রকল্প। রাজ্যের মধ্যে এটিই প্রথম কার্যকর স্লারি পাইপলাইন।
এছাড়াও তিনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন ৪.৫ MTPA ইন্টিগ্রেটেড স্টিল প্ল্যান্ট, একটি ১০০-শয্যার মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল, একটি স্কুল ও ১১৬ একরের লয়েডস টাউনশিপের। লয়েডস হল ভারতের অন্যতম প্রধান লৌহ আকরিক প্রস্তুতকারী সংস্থা।
তথ্য বলছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৫০ জনেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন গড়চিরৌলিতে। তবে ২০২০-র পর থেকে আর কোনও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণহানির খবর নেই। মাওবাদীদের দমন করছে সি-৬০ কমান্ডো ও সিআরপিএফ-এর যৌথ অভিযান, সঙ্গে রয়েছে ড্রোন নজরদারি।
২০১৬ সালে শুরু হয়েছিল সুরজগড় অঞ্চলে খননকাজ। কিন্তু আজকের এই শোধনাগার গড়চিরৌলির ইতিহাসে প্রথম। যেখানে এতদিন বনজ ও কৃষি পণ্যই ছিল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি, আজ সেখানে দাঁড়াচ্ছে ভারী শিল্প।
গত পাঁচ বছরে গড়চিরৌলিতে ৭০ জনেরও বেশি মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন ও মূল স্রোতে ফিরেছেন, যাঁদের মাথার সম্মিলিত পুরস্কারমূল্য ছিল ২.৮ কোটি টাকা। ২০০৫ সাল থেকে মহারাষ্ট্রে মোট ৭০৪ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন।
আত্মসমর্পণের মূল কারণ হিসেবে জানা যায়, মতাদর্শে বিতৃষ্ণা এবং সরকারের পুনর্বাসন নীতি। শীর্ষ নেতাদের জন্য ৫ লক্ষ এবং মাঝারি অথবা নিম্নপদস্থদের জন্য ২.৫ লক্ষ টাকার অনুদানও রয়েছে।
বর্তমানে গোটা গড়চিরৌলিতে মাত্র ৪০ জন মাওবাদী চিহ্নিত ক্যাডার রয়েছে, যার মধ্যে ২৪ জন সক্রিয়। ২০২১ সালে ৫০ লক্ষ টাকার মাথার দাম থাকা মাওবাদী নেতা মিলিন্দ তেলতুম্বডে গুলিযুদ্ধে নিহত হন। এটি ছিল মাওবাদীদের জন্য বড় ধাক্কা। ২০২১ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৬ জন মাওবাদী সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন।
২০২৪ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনে গড়চিরৌলিতে ৭৩.৬৮% ভোট পড়েছে, যা মুম্বই (৫২.০৭%) ও পুণে (৬০.৭%) থেকেও বেশি। এটি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর আস্থা বাড়ছে এই জেলাবাসীর।
মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবীস ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন, গড়চিরৌলির উত্তরাংশ মাওবাদী-মুক্ত এবং দক্ষিণ অংশও খুব শিগগিরই সেই পথে হাঁটবে। রাজ্য সরকার সম্প্রতি মহারাষ্ট্র স্পেশাল পাবলিক সিকিউরিটি বিল পাশ করেছে, যা মাওবাদী বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে বেআইনি ঘোষণা করে, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা ও ২-৭ বছরের কারাবাসের বিধান দিয়েছে।
গত দু'বছরে ৭১টি লাইব্রেরি তৈরি হয়েছে এখানে, ৮০০০-এরও বেশি ছাত্রছাত্রী এতে যুক্ত। মে মাসে রাজ্যের প্রথম ইনফ্ল্যাটেবল থিয়েটারও তৈরি হয় গড়চিরৌলিতে। সমস্ত অত্যাধুনিক পরিষেবাই সেই এসি হলে রয়েছে।
শুধু তাই নয়। ডাঃ অভয় ও ডাঃ রানি বাং-এর নেতৃত্বে ১৯৯০ সাল থেকে উপজাতি এলাকাগুলিতে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে নিরলস কাজ চলছে। তাঁদের উদ্যোগে নবজাতকের মৃত্যুহার অনেকটাই কমেছে এখানে।
পাশাপাশি, মেন্দা লেখার মতো গ্রামে ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্টের সুযোগ নিয়ে কৃষকরা নিজেরাই বাঁশ বিক্রি করে আয় বাড়াচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, লাল সন্ত্রাসের শেকড়ে বাঁধা এই জেলায় ধীরে হলেও আসছে বদল। রাস্তাঘাট, শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার হাত ধরে একটি নতুন গড়চিরৌলি গড়ে উঠছে, যেখানে বন্দুকের গর্জনের বদলে বাজছে উন্নয়নের সুর।