আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই শবরীমালা মন্দিরে দ্বারপালক দেবমূর্তি ও দরজার সোনার আবরণ খোলা হয় এবং ওজন করা হয় ৪২.৮ কিলোগ্রাম।

শবরীমালা মন্দিরের সোনার দরজা
শেষ আপডেট: 10 October 2025 15:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেরলের শবরীমালা মন্দিরের (Sabarimala Temple) এক পবিত্র নিদর্শন ঘিরে এখন তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি (Sabarimala Gold Door's Journey)। স্বর্ণখচিত দরজার (Sabarimala Gold Door) প্যানেল, যা মন্দিরের দ্বাররক্ষক (দ্বারপালক) দেবমূর্তির সঙ্গে যুক্ত, সেই সোনার পাতে ঢাকা দরজা ২০১৯ সালে মন্দির থেকে খুলে নেওয়া হয়েছিল সংস্কারের জন্য। সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দরজা ৩৯ দিন ধরে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর পর মন্দিরে ফিরে আসে, আর সেই সময়েই ধরা পড়ে প্রায় সাড়ে চার কিলো সোনা উধাও হয়ে গিয়েছে! এখন এই ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কেরল হাইকোর্ট।
২০১৯ সালের ‘রেস্টোরেশন’ প্রকল্প থেকেই রহস্যের সূচনা
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই শবরীমালা মন্দিরে দ্বারপালক দেবমূর্তি ও দরজার সোনার আবরণ খোলা হয় এবং ওজন করা হয় ৪২.৮ কিলোগ্রাম। পরের দিন, ২০ জুলাই, ওই সোনার পাতঢাকা দরজা পাঠানো হয়েছিল চেন্নাইয়ের স্মার্ট ক্রিয়েশনস নামের সংস্থায়, যারা ইলেক্ট্রোপ্লেটিংয়ের কাজ করার দায়িত্বে ছিল।
কিন্তু অবাক করা ব্যাপার, চেন্নাই পৌঁছতে সময় লাগে ৩৯ দিন! ২৯ অগস্ট পৌঁছনোর পর সংস্থা জানায়, দরজার ওজন নেমে এসেছে ৩৮.২৫ কিলোগ্রামে, অর্থাৎ প্রায় ৪.৫৪ কিলো সোনা উধাও।
তদন্তে উঠে এসেছে, দরজাগুলি সরাসরি চেন্নাইয়ে না গিয়ে ঘুরেছে একাধিক জায়গায়। কোত্তায়মের এক ব্যক্তিগত মন্দিরে, অন্ধ্রপ্রদেশের কিছু মন্দিরে, বেঙ্গালুরুর শ্রীরামপুরমের আয়াপ্পা মন্দিরে, এমনকি অভিনেতা জয়রামের বাড়িতেও একটি ব্যক্তিগত পুজোয় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল দরজার প্যানেলগুলি।
স্মার্ট ক্রিয়েশনস তাদের ফেসবুক পোস্টে লিখেছিল, “দ্বারপালক দেবমূর্তির কাভচমগুলি চেন্নাইয়ে পদ্মশ্রী অভিনেতা শ্রী জয়রামের বাড়িতে পুজোর পর পুনরায় শবরীমালায় ফেরানো হয়।”
এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পরই প্রশ্ন ওঠে, এটা কি সেই একই দরজা, যা মন্দির থেকে খোলা হয়েছিল? আর যদি হয়, তাহলে সোনা কোথায় গেল?
আদালতে এখন মূল প্রশ্ন তিনটি—
তথ্য বলছে, মন্দিরে প্রথম বড় সোনার দানটি এসেছিল ১৯৯৮ সালে ব্যবসায়ী বিজয় মাল্যর কাছ থেকে। তিনি তখন প্রায় ৩০ কিলো সোনা দান করেছিলেন। পরের বছর আরও ৮০০ গ্রাম সোনা যোগ হয় দরজার আবরণে। বিগত বছরগুলিতে আদালত ও ভিজিল্যান্স রিপোর্টে বারবার প্রশ্ন উঠেছে, এই সোনার হিসেব কি সঠিকভাবে রাখা হয়েছিল?
হাইকোর্টের নির্দেশ ও তদন্ত
কেরল হাইকোর্টের বিচারপতি রাজা বিজয়ারাঘবন ভি ও কে ভি জয়কুমারের বেঞ্চ মামলাটির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
ট্রাভানকোর দেবস্বম বোর্ড (TDB)-এর ভিজিল্যান্স অফিসারকে সমস্ত নথি জব্দ করে সিল করা রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে এডিজিপি এইচ ভেঙ্কটেশের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল (SIT) গঠন করেছে।
বিজেপি এবং বিরোধী দলগুলি অভিযোগ তুলেছে, এটি দেবস্বম বোর্ডের ভিতরে “চূড়ান্ত দুর্নীতি ও সোনা চুরির” প্রমাণ। কেরলের নানা প্রান্তে বিজেপির বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। কোঝিকোড়ে প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি কে সুরেন্দ্রনের নেতৃত্বে বিক্ষোভে পুলিশের জলকামান ও ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা হয়।
সুরেন্দ্রন বলেন, “থিরুবনন্তপুরমের সোনা পাচার কাণ্ডের মতো এখানেও কোটি টাকার সোনা লোপাট হয়েছে। এবার দেবস্বম বোর্ডের সম্পদ লুট হচ্ছে। আমরা চাই, তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে হোক।”
২০১৯ সালে মন্দিরের স্পনসর উন্নিকৃষ্ণন পোত্তি-র পাঠানো এক ইমেলে উল্লেখ ছিল, তিনি “অতিরিক্ত সোনা” ব্যক্তিগত কাজে, এমনকি বিয়েতে ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলেন। হাইকোর্ট এই তথ্যকে “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলেও মন্তব্য করেছে। দেবস্বম বোর্ডের দাবি, সব নিয়ম মেনেই প্যানেল হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে তদন্তও হয়েছিল।
বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে দরজাটি?
চেন্নাইয়ের কাজ শেষের পর দরজাটি ফেরত এসেছে বলে বোর্ড জানিয়েছে। তবে আদালত রেজিস্টার ও ইনভেন্টরি জব্দ করে রেখেছে এবং এখনও স্পষ্ট নয়, এটি আসল দরজা নাকি নকল কপার প্লেটেড প্রতিরূপ। তদন্তকারী দলকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ রিপোর্ট জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।