শবরীমালা অভিযানের পর থেকেই ডানপন্থীদের হামলা, গাড়ি চাপা দেওয়ার চেষ্টা, একের পর এক শারীরিক ও মানসিক আক্রমণ পোহাতে হয়েছিল তাঁকে।

বিন্দু আম্মিনি
শেষ আপডেট: 14 September 2025 15:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের রাজধানী (Delhi) প্রায়শই মহিলাদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক শহর বলে চিহ্নিত হয়। অথচ কেরলের (Kerala) আইনজীবী ও সমাজকর্মী বিন্দু আম্মিনির (Bindu Ammini) আশ্রয় মিলেছে এখানেই। নিজের রাজ্যে আর থাকা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে।
২০১৮ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) শতাব্দীপ্রাচীন নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে ঘোষণা করে, ঋতুমতী মহিলারাও কেরলের শবরীমালা মন্দিরে (Sabarimala Temple) প্রবেশ করতে পারবেন। সেই রায়ের পর প্রথম যাঁরা পাহাড়ি মন্দিরে পা রাখেন (First Woman who entered Sabarimala), তাঁদের একজন ছিলেন বিন্দু আম্মিনি। সেই মুহূর্ত তাঁর জীবনকেই আমূল পালটে দেয়।
শবরীমালা অভিযানের পর থেকেই ডানপন্থীদের হামলা, গাড়ি চাপা দেওয়ার চেষ্টা, একের পর এক শারীরিক ও মানসিক আক্রমণ পোহাতে হয়েছিল তাঁকে। অনলাইনে ছড়াতে থাকে অশ্লীল ভিডিও ও কুৎসা। এমনকি কয়েকদিন আগেও সাইবার সেলে অভিযোগ করেছেন তিনি। জানিয়েছিলেন, তাঁর নামে ভুয়ো ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, যার দর্শকসংখ্যা ইতিমধ্যেই কুড়ি লক্ষ ছাড়িয়েছে।
বিন্দুর আক্ষেপ, “ডানপন্থীরা অন্তত প্রকাশ্যে আক্রমণ করে। কিন্তু কেরলের বাম সরকারই (Left Government) নীরবে আমাকে ছুরিকাঘাত করেছে।”
২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ জানায়, নারীদের প্রবেশ আটকানো বৈষম্যমূলক। রাজ্যের বাম সরকার স্বাগত জানায় রায়কে। কংগ্রেস প্রশ্ন তোলে আচার-সংস্কারের ওপর হস্তক্ষেপ নিয়ে। বিজেপি সরাসরি রায়ের বিরোধিতা করে বাম সরকারকে ‘অহিন্দু’ বলে আক্রমণ শানায়।
ফলে অশান্তি ছড়ায় গোটা কেরলে। আরএসএস-সহ বিভিন্ন সংগঠন পথে নামে। বিক্ষোভে মৃত্যু হয় ৩ জনের, জখম হন শতাধিক মানুষ, সাংবাদিক থেকে শুরু করে মহিলা ও পুলিশ কর্মীরাও বাদ যাননি। ৫০০-রও বেশি মামলা হয়, ৩ হাজারের কাছাকাছি গ্রেফতার। একাধিক সিপিএম অফিসে বোমা হামলা চলে।
২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি বাম সরকার সংগঠিত করে ঐতিহাসিক ভনিতা মথিল। ৬২০ কিমি জুড়ে ৩০ লক্ষ মহিলা মানবশৃঙ্খল তৈরি করে শপথ নেন পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে। পাল্টা #ReadyToWait আন্দোলন করে প্রচারে নেমে পড়েন বিরোধীরা। দাবি ওঠে ধর্মাচরণের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করার।
২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি সকালে, পুলিশি নিরাপত্তা ঘিরে কালো চুড়িদার পরে বিন্দু আম্মিনি ও তাঁর সঙ্গিনী কনকদুর্গা মন্দিরে প্রবেশ করেন। ইতিহাস গড়ে ওঠে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘শুদ্ধিকরণ’ করে মন্দির বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকেই তাঁদের পরিবারকে গোপন আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ছ’ বছর কেটে গেলেও বিন্দুর নাম ওই ঘটনার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। এ বার কেরল সরকার যখন তিরুবাঙ্কুর দেবস্বম বোর্ডের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘গ্লোবাল অয়্যাপ্পা সঙ্গমম’-এর আয়োজন করছে, তখনই মন্ত্রী ভি. এন. বাসবন জানিয়ে দিলেন, “বিন্দুকে কোনও অবস্থাতেই আমন্ত্রণ জানানো হবে না।”
দিল্লির ময়ূর বিহারে ছোট্ট অফিসে বসে আজও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বিন্দু। বলছেন, জন্ম থেকেই জাতের কারণে মানুষের রোষ সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। শবরীমালা প্রবেশ তাঁকে ইতিহাসে স্থান দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে কেড়ে নিয়েছে তাঁর ঘর। তাঁকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে অনন্ত নির্বাসনে।