সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনও এখানে প্রাসঙ্গিক। জর্জিয়ায় বিক্ষোভ দমাতে রেড আর্মি গুলি ও বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করেছিল। অথচ সেখান থেকেই সোভিয়েত ভাঙনের সূচনা।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 14 September 2025 13:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রাষ্ট্র কি সত্যিই কখনও ‘শক্তিশালী’ বা ‘নমনীয়’? নাকি রাষ্ট্র মানেই তার মূল শক্তি সংহতি, শৃঙ্খলা এবং কার্যকারিতা? সম্প্রতি নেপালে (Nepal Protest) জেন জি আন্দোলনে (Gen Z) মাত্র এক দিনের মধ্যে নির্বাচিত সরকারের পতনে সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে। এর আগে শ্রীলঙ্কা (জুলাই ২০২২) এবং বাংলাদেশে (অগস্ট ২০২৪) একইভাবে জনরোষের কারণে সরকার ভেঙে পড়েছিল। তিন উদাহরণে একটি ধারা তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের ভেতরে বিশেষ করে বিজেপি ঘনিষ্ঠ মহল থেকে অভিযোগ উঠছে, এ যেন এক ধরনের “রেজিম-চেঞ্জ টুলকিট”, যা নেপালের মতোই দিল্লিতেও প্রয়োগ করা হতে পারে। তবে ইতিহাস অন্য কথা বলছে।
পাকিস্তানের ঘটনা এখানে ব্যতিক্রম। ২০২৩ সালের ৯ মে ইমরান খানের সমর্থকেরা লাহোর-সহ একাধিক শহরে দাঙ্গা চালালেও রাষ্ট্র টলে যায়নি। সরকার বদলায়নি, বরং আন্দোলনকারীদের দমন করে ইমরানকেই জেলে পাঠানো হয়েছে ১৪ বছরের সাজায়। আজও একই জোট ক্ষমতায়, আর বিরোধীরা সেনা আদালতে বিচারের মুখোমুখি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান কি সত্যিই ‘হার্ড স্টেট’? না, বাস্তবে তা একটি কার্যকর রাষ্ট্র, যা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম।
অন্যদিকে, কাঠমান্ডুর পতন দেখিয়ে দিল, শুধু নির্বাচিত সরকার থাকলেই রাষ্ট্র কার্যকর হয় না। মাওবাদী নেতৃত্ব, যারা এক সময় বিপ্লবের প্রতীক ছিলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন। তাদের অভিজ্ঞতা ছিল গেরিলা লড়াইয়ে, গণআলোচনায় নয়। ফল, সামান্য বিক্ষোভ সামলাতেও প্রশাসনের অসহায়তা, আর সেনাবাহিনী হয়ে উঠল জনগণের শেষ ভরসা।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনও এখানে প্রাসঙ্গিক। জর্জিয়ায় বিক্ষোভ দমাতে রেড আর্মি গুলি ও বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করেছিল। অথচ সেখান থেকেই সোভিয়েত ভাঙনের সূচনা। কংগ্রেস আমলে ভারতের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিং একবার রাশিয়ার কূটনীতিককে বলেছিলেন, “আপনাদের যদি সিআরপিএফ থাকত, তাহলে বুঝতে পারতেন গণআন্দোলন দমন মানে শুধু গুলি নয়, দরকার ধৈর্য ও আলোচনা।”
ভারতে কি সম্ভব এমন ‘টুলকিট’ আন্দোলনে সরকার বদল? ইতিহাস বলছে না। ১৯৭৪-৭৫ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন কিংবা আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, কোনওটাই সরকার ফেলে দিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পথেই সরকার পরিবর্তন হয়েছে। সংসদীয় ব্যবস্থা, রাজনৈতিক বিরোধিতা আর বিরোধী দলের উপস্থিতিই আসলে রাষ্ট্রকে রক্ষা করে।
মোদ্দা কথা, রাষ্ট্রকে কার্যকর রাখতে হলে শুধু বাহিনী নয়, দরকার আইনের শাসন, আলোচনার সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক ধৈর্য। শক্তি বা নমনীয়তায় নয়, রাষ্ট্র টিকে থাকে কার্যকারিতায়। যেমন ২০১০-এ উপত্যকার অস্থির সময়ে তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এম.কে. নারায়ণন বলেছিলেন, রাষ্ট্রের সংহতি আসলে তার অন্তরের শক্তির উপর নির্ভর করে। আজ কাশ্মীরের পরিস্থিতি সেই কথার প্রমাণ দিচ্ছে।