পরিকল্পনা ছিল ভয়ঙ্কর। একসঙ্গে বহু শহরে ছড়িয়ে রাখা হত ডজন ডজন বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি - যেখানে ব্যবহার করা হত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ফুয়েল অয়েল।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 15 November 2025 12:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দিল্লির লালকেল্লার ঘটনা (Delhi Red Fort Blast) দেখে অনায়াসে বলা যায়, ভারতে সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন শিহরণ-জাগানো অধ্যায় খুব কমই দেখেছে। তদন্তকারীরা এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছেন, আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের (Al Falah University) ছয় চিকিৎসকের দলটি এমন একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ-চক্রের ছক কষেছিল, যা বাস্তবায়িত হলে ১৯৯৩ সালের মুম্বই ধারাবাহিক বিস্ফোরণের (1993 Mumbai Blast) পর দেশের সবচেয়ে মারাত্মক হামলা হত।
পরিকল্পনা ছিল ভয়ঙ্কর। একসঙ্গে বহু শহরে ছড়িয়ে রাখা হত ডজন ডজন বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি (Explosive Cars) - যেখানে ব্যবহার করা হত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ফুয়েল অয়েল। বিস্ফোরণের পরিধি এমনই হত যে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি অবধারিত ছিল।
এই চক্রের একজন ডাঃ মহম্মদ উমর নবি আত্মঘাতী বিস্ফোরণ (Suicide Attack) ঘটিয়েছেন। ১০ নভেম্বর লালকেল্লার কাছে তাঁর গাড়ি বিস্ফোরণে প্রাণ হারান ১৩ জন। তদন্তে জানা গেছে, দু’ বছরেরও বেশি সময় ধরে র্যাডিক্যালাইজড পেশাদারদের এই মডিউল দিল্লি, এনসিআর-সহ একাধিক শহরে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের (Jammu Kashmir Police) তৎপরতা না থাকলে অক্টোবরের শেষে শ্রীনগরে জইশ-ই-মহম্মদের (JeM) প্রশংসাপত্র সম্বলিত পোস্টার থেকে যদি সূত্র না মিলত, ভারতে হয়তো ১৯৯৩-এর ভয়াবহ স্মৃতি (1993 Blast) ফের ফিরে আসত।
১৯৯৩-এর মুম্বই হামলা
১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ, একটানা দু’ ঘন্টার মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১২টি বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি। মুম্বই স্টক এক্সচেঞ্জ, ডায়মন্ড মার্কেট, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, এয়ার ইন্ডিয়া সদর, ৫-তারকা হোটেল ও আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। ২৫৭ জনের মৃত্যু, ১৪০০-রও বেশি মানুষ আহত হন সেই ঘটনায়।
তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আইএসআই (ISI) - যার নেতৃত্বে ছিলেন জাভেদ নাসির, তিনিই দাউদ ইব্রাহিমের (Dawood Ibrahim) ছত্রছায়ায় এই হামলার তিন ধাপের পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। ওয়াহ নোবেল ইন্ডাস্ট্রিজের তৈরি সামরিক-গ্রেড RDX চোরাপথে মহারাষ্ট্র উপকূলে পৌঁছে বোমা হয়ে ওঠে টাইগার মেমনের বাড়িতে। পরে তা গাড়ি-স্কুটিতে ভরে শহরের অপারেশনাল কেন্দ্রগুলোয় রেখে দেওয়া হয়।
দাউদের দলনেতারা দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে বন্দুক-গ্রেনেড নিয়ে সরকারি ভবনে হামলা এবং বৃহৎ সংঘাতের প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু বিস্ফোরণের পর আতঙ্কে তারা পালিয়ে যায়, ফলে দুই ধাপই থমকে যায় তাদের সব পরিকল্পনা।
ফরিদাবাদ মডিউলের চক্রান্ত
তদন্তে জানা গেছে, এই মডিউল প্রায় তিন টন বিস্ফোরক উপাদান জোগাড় করেছিল যা ছিল মূলত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। তা ‘Poor Man’s TNT’ নামে পরিচিত। শক্তিতে RDX বা TNT-এর তুলনায় দুর্বল হলেও, গাড়িভর্তি ‘ফার্টিলাইজার বোম’ - সংখ্যা বেশি হলে প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। পরিকল্পনা ছিল ঠিক সেভাবেই।
হরিয়ানা ও জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের ১০ নভেম্বরের অভিযানই ছিল একধরনের সৌভাগ্য, যেমনটা মুম্বই পুলিশ টাইগার মেমনের বাড়িতে বিস্ফোরক-ভর্তি গাড়িগুলি পেলে হতে পারত। পার্থক্য শুধু একটাই, মুম্বই পুলিশ তা পারেনি। ফলে বাঁচানো সম্ভব হয়নি ২৫৭টি প্রাণ।
আন্তর্জাতিক যোগের সন্ধান
এনআইএ (NIA) এখন খতিয়ে দেখবে এই চিকিৎসক-চালিত সন্ত্রাস মডিউলের পিছনে কারা ছিল? জইশ-ই-মহম্মদ (JeM) কী নির্দেশ দিয়েছিল? এবং কোনও রাষ্ট্রীয় সংস্থার হাত এতে জড়িত কিনা।
ধারাবাহিক, নিখুঁত বিস্ফোরণের ছাপ দেখলেই বোঝা যায় - এটি মিলিটারি ধাঁচের পরিকল্পনা। ১৯৯৩-এ যেমন ছিল আইএসআইয়ের ছায়া। জাভেদ নাসির, তৎকালীন আইএসআই প্রধান ছিলেন ট্যাবলিঘি জামাতের সদস্য এবং তাঁর উগ্র মতাদর্শের জন্য ভারতীয় তদন্তকারীরা তাঁকে ডাকত ‘জেহাদি জেনারেল’ বলে।
ভারতে পালিয়ে আসা ১৯৯৩-এর অভিযুক্তদের জবানবন্দিতে স্পষ্ট, প্রত্যেক পাকিস্তান সফরের পর টাইগার মেমন সামরিক কমান্ডারের মতো নির্দেশ দিতেন। তাকেও কেউ ওপর থেকে নির্দেশ দিত। আজও পলাতক মেমন রয়েছে করাচিতেই।
২০২৫ সালের এই নয়া ষড়যন্ত্রেও যদি পাকিস্তানি সন্ত্রাস-নির্দেশের ছায়া মেলে, তাহলে তা হবে এই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়।