শেষ কর্মদিবসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন বিচারপতি গাভাই। কথা প্রসঙ্গে উঠল 'জুতো' ঘটনার প্রসঙ্গও (shoe incident CJI Gavai)।

বিচারপতি বি আর গাভাই
শেষ আপডেট: 24 November 2025 12:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের ৫২তম প্রধান বিচারপতি (52th CJI BR Gavai) হিসেবে শেষ কর্মদিবসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন বিচারপতি বি আর গাভাই। আলোচনায় উঠে এল নানা প্রসঙ্গ, এল প্রধান বিচারপতি থাকাকালীন নানা উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত (Ex CJI BR Gavai conversation on his tenure)। কথা প্রসঙ্গে উঠল সেই সময়টির কথা, যখন আদালতে সর্বসমক্ষে তাঁকে লক্ষ্য করে এক প্রবীণ আইনজীবী জুতো ছুড়ে মারার চেষ্টা করেছিলেন (shoe attack on CJI Gavai)। ভগবান বিষ্ণু-সংক্রান্ত তাঁর মন্তব্যে (Vishnu idol comment Gavai) ক্ষোভ প্রকাশ করেই সেই হামলা হয়েছিল।
রবিবার সরকারি আবাসনে এক অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় বিচারপতি গাভাই বললেন, “ওটা ছিল একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত এক সিদ্ধান্ত। ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠা মানসিকতার প্রভাবই হয়তো কাজ করেছিল। আমার মনে হয়েছিল, সবচেয়ে সঠিক প্রতিক্রিয়া হল পুরো ঘটনাটিকে উপেক্ষা করা।”
কী ঘটেছিল সেদিন?
অক্টোবরের ৫ তারিখ। সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) ভরদুপুরে হঠাৎই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ৭১ বছর বয়সি সিনিয়র অ্যাডভোকেট রাকেশ কিশোর (Rakesh Kishore shoe attack on CJI) বিচারপতি গাভাইকে লক্ষ্য করে জুতো ছুড়ে মারতে উদ্যত হন। নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে দ্রুত আদালতকক্ষ থেকে বের করে আনেন। বের হওয়ার সময় কিশোরের গলা থেকে শোনা গিয়েছিল, “সনাতন ধর্মের অপমান ভারত বরদাস্ত করবে না।”
ঘটনার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই মধ্যপ্রদেশের এক ভগ্নদশা বিষ্ণু মূর্তি পুনঃস্থাপনের মামলার শুনানিতে বিচারপতি গাভাই মন্তব্য করেছিলেন, “যাও, দেবতাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করো” - যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
ছয় মাসের মেয়াদ, আইনের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য এক অধ্যায়
চলতি বছর মে থেকে নভেম্বর, মাত্র ছয় মাসের জন্য দেশের প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ছিলেন বি আর গাভাই। তিনি প্রথম বৌদ্ধ এবং দ্বিতীয় দলিত বিচারপতি, যিনি ভারতের বিচারব্যবস্থার শীর্ষপদে বসেছিলেন।
এরপর দায়িত্ব নেবেন বিচারপতি সূর্য কান্ত (Justice Surya Kant) - যিনি ৩৭০ অনুচ্ছেদ মামলা, পেগাসাস ও নির্বাচনী সংস্কার-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়ের অংশ ছিলেন।
'পূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে যাচ্ছি' - পোস্ট-রিটায়ারমেন্ট পদ নেবেন না প্রাক্তন বিচারপতি
শেষ দিনের আলাপচারিতায় গাভাই বলেন, “সম্পূর্ণ তৃপ্তি ও সন্তুষ্টি নিয়ে আমি এই পদ ছাড়ছি। দায়িত্ব নেওয়ার দিনই বলেছিলাম অবসরের পর কোনও সরকারি পদ নেব না। আগামী ৯-১০ দিন একটু বিরতি। তারপর নতুন ইনিংস।”
সংরক্ষণে 'ক্রিমি লেয়ার', মহিলা বিচারপতি, কলেজিয়াম - সব ইস্যুতেই খোলামেলা মত
৬৪ বছরের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এদিন তাঁর মেয়াদ চলাকালীন ঘটা প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই মত দেন।
তফসিলি জাতি (SC)-দের মধ্যে 'ক্রিমি লেয়ার' (creamy layer)
তিনি বলেন, “যদি বারবার একই পরিবারে সুবিধা যায়, তাহলে শ্রেণির মধ্যে আরেক শ্রেণি তৈরি হয়। সংরক্ষণের সুবিধা তাদেরই পাওয়া উচিত, যাদের সত্যিই দরকার।”
আরও যোগ করলেন, “৭৬ বছরে বহু তফসিলি জাতি পরিবার উন্নতি করেছে। প্রথম প্রজন্ম যদি সংরক্ষণে আইএএস পদের সুবিধা পায়, এবং পরের প্রজন্মও একই সুবিধা পায়, তবে কি বলা যায় তারা এখনও ‘needy’? সংরক্ষণ তো তাদের জন্য, যাদের সত্যিই প্রয়োজন।”
কলেজিয়াম ব্যবস্থার কড়া সাপোর্ট
গাভাইয়ের কথায়, “বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা সর্বাধিক জরুরি। কলেজিয়াম সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করে। স্বাধীনতার মানে সবসময় সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া নয়, বরং নথিপত্র ও প্রমাণ দেখে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া।”
মহিলা বিচারপতি নিয়োগে ব্যর্থতার আক্ষেপ
তাঁর কথায়, “কিছু নাম পর্যালোচনা হয়েছিল, কিন্তু কলেজিয়ামের মধ্যে ঐকমত্য হয়নি।”
গভর্নরদের বিল-পেন্ডিং রাখা, এবং সাম্প্রতিক রায় প্রসঙ্গে
সাম্প্রতিক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট গভর্নর ও রাষ্ট্রপতির বিল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট সময়সীমা তুলে দিলেও “অনির্দিষ্টকাল ফেলে রাখা যাবে না” - এ কথা স্পষ্ট করেছে।
গাভাই বললেন, “সংবিধানের ভিত্তি হল ক্ষমতার বিচ্ছেদ। আইন করার অধিকার সংসদের। নানা কারণে গভর্নর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করতে পারেন, কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনও বিল আটকে রাখা চলবে না।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন, চূড়ান্ত দেরির ক্ষেত্রে বিচারিক পুনর্মূল্যায়ন খোলা থাকবে।
সাম্প্রতিক পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এবং বিরোধীশাসিত রাজ্যগুলির আপত্তি খারিজ
গত ২০ নভেম্বর বিচারপতি গাভাইয়ের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলের প্রাথমিক আপত্তি খারিজ করে দেয়, যেখানে প্রেসিডেনশিয়াল রেফারেন্সের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। বেঞ্চ জানায়, সংবিধান ব্যাখ্যার মাধ্যমে প্রজাতন্ত্র ও তার নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষাই আদালতের পরামর্শমূলক ভূমিকার মূল উদ্দেশ্য।