বিগত কয়েক মাসের এই বিশৃঙ্খলা থেকে শিক্ষা নিয়েই সরকার এবার পরিস্থিতির ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। একদিকে যেমন পাইলটদের বিশ্রাম জরুরি, অন্যদিকে যাত্রীদের পরিষেবা যাতে স্তব্ধ না হয়, সেদিকেও কড়া নজর রাখছে মন্ত্রক।

পাইলটদের উড়ান-বিধিতে সাময়িক ছাড়
শেষ আপডেট: 7 April 2026 17:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের বিমান পরিষেবা ক্ষেত্রে বড়সড় স্বস্তি দিতে পাইলটদের উড়ান-বিধিতে সাময়িক ছাড় (DGCA Temporarily Relaxes Pilot Duty Norms) ঘোষণা করল ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGCA)। মঙ্গলবার অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, মূলত দূরপাল্লার বিমানের ক্ষেত্রে পাইলটদের ‘ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশন’ বা উড়ানের সময়সীমায় (FDTL) এই বদল আনা হয়েছে (DGCA new norms for pilots)।
মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠকে মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব আসংবা চুবা আও জানান, পরিষেবা মসৃণ রাখতেই এই কঠোর পদক্ষেপ।
কেন এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত?
এই সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ। প্রথমত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া তীব্র সংঘাত। আরব দুনিয়ার এই রণক্ষেত্রের জেরে ওই অঞ্চলের আকাশপথ ব্যবহারের ওপর একগুচ্ছ বিধিনিষেধ জারি হয়েছে। ফলে দীর্ঘ পথ ঘুরে বিমান চালাতে গিয়ে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে বিমান সংস্থাগুলি। দ্বিতীয়ত, গত বছরের শেষে দেশের বৃহত্তম বিমান সংস্থা ইন্ডিগোর নজিরবিহীন পরিষেবা বিপর্যয়।
ইন্ডিগো সংকট ও ডিজিসিএ-র কড়াকড়ি
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কার্যত ভেঙে পড়েছিল ইন্ডিগোর উড়ান পরিষেবা। শত শত বিমান বাতিল এবং হাজার হাজার যাত্রীর ভোগান্তির জেরে কাঠগড়ায় ওঠে এই বিমান সংস্থা। রাজ্যসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুরলীধর মোহল জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই পরিষেবাকে অতিরিক্ত বাড়িয়ে ফেলা, সফটওয়্যার ও ম্যানেজমেন্টের ত্রুটি এবং নিয়মের অভাবই ছিল এই বিপর্যয়ের আসল কারণ। এর ফলে নিয়ম ভাঙার দায়ে ইন্ডিগোর বিরুদ্ধে একাধিক কঠোর ব্যবস্থা নেয় নিয়ামক সংস্থা।
পাইলটদের উড়ান-বিধিতে কী বদল এল?
পাইলটদের ক্লান্তি কমাতে গত বছরই ডিজিসিএ নতুন নিয়ম কার্যকর করেছিল। যেখানে বলা হয়েছিল, পাইলটদের সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টার পরিবর্তে একটানা ৪৮ ঘণ্টা বিশ্রাম দিতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
সূত্রের খবর, যে সমস্ত দূরপাল্লার বিমানে দু’জন পাইলট থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ‘ফ্লাইট টাইম’ (FT) বা ওড়ানোর সময় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট বাড়িয়ে ১১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট করা হয়েছে। পাশাপাশি, তাঁদের মোট ‘ডিউটি পিরিয়ড’ ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট বাড়িয়ে ১১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিমানটি রানওয়েতে প্রথম চলা শুরু করা থেকে ল্যান্ডিংয়ের পর সম্পূর্ণ থেমে যাওয়া পর্যন্ত সময়কে ‘ফ্লাইট টাইম’ হিসেবে ধরা হয়।
কড়া নজরদারিতে বিমান সংস্থাগুলি
তবে নিয়ম শিথিল করলেও বিমান সংস্থাগুলিকে যেনতেন প্রকারেণ পার পাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না সরকার। মন্ত্রী মোহল জানিয়েছেন, ডিজিসিএ এখন অনেক বেশি কঠোরভাবে নিয়ম পালন করাচ্ছে। পাইলটদের রোস্টার মেনটেন করা হচ্ছে কি না, পর্যাপ্ত ব্যাক-আপ থাকছে কি না বা নিয়মের ফাঁকফোকর দিয়ে বেশি কাজ করানো হচ্ছে কি না, তা দেখতে প্রতি ১৫ দিন অন্তর মনিটরিং এবং দু’মাস অন্তর সরেজমিনে তদন্ত চালাবে ডিজিসিএ।
ভুলের খেসারত ও শিক্ষা
ইন্ডিগোর সংকটের নেপথ্যে একটি বড় কারণ ছিল অব্যবস্থাপনা। গত ১ নভেম্বর থেকে পাইলটদের বিশ্রামের নতুন নিয়ম কার্যকর হলেও ইন্ডিগো তা নিয়ে ঠিকমতো পরিকল্পনা করেনি। তারা ভেবেছিল সরকার হয়তো নিয়ম কার্যকর করার সময় আরও বাড়িয়ে দেবে। ফলে পর্যাপ্ত পাইলট নিয়োগ বা প্রশিক্ষণের বদলে বিদ্যমান কর্মীদের দিয়েই বাড়তি কাজ চালানোর চেষ্টা করা হয়। যার ফলশ্রুতি হিসেবে চূড়ান্ত ব্যস্ততার মরশুমে একের পর এক বিমান বাতিলের ঘটনা ঘটে।
বিগত কয়েক মাসের এই বিশৃঙ্খলা থেকে শিক্ষা নিয়েই সরকার এবার পরিস্থিতির ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। একদিকে যেমন পাইলটদের বিশ্রাম জরুরি, অন্যদিকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে যাত্রীদের পরিষেবা যাতে স্তব্ধ না হয়, সেদিকেও কড়া নজর রাখছে মন্ত্রক।