নয়ডার গৌর সিটির কয়েকটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, তাঁর বস্তিতে থাকা বহু বাংলাভাষী ইতিমধ্যেই ট্রেনের টিকিট কেটে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে গেছেন। তিনিও পরিবারের সঙ্গে ফিরছেন।

বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা হঠাৎ শহর ছাড়ছেন
শেষ আপডেট: 12 August 2025 13:50
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'রান্নার লোক এবং পরিচারিকা লাগবে'- নয়ডার গৌর সিটি সেভেন্থ অ্যাভিনিউ হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এমন বার্তা ভেসে উঠছে বারবার। গত দু'সপ্তাহ ধরে আশপাশের বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকাতেও একই রকম পোস্টে ভরে যাচ্ছে বাসিন্দাদের গ্রুপ। হঠাৎ করে বিপুল সংখ্যক বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক (Bengali migrants) শহর ছেড়ে চলে যাওয়ায় নয়ডা ও গুরগাঁওতে গৃহকর্মী সঙ্কট তৈরি হয়েছে (Delhi stares at house help crisis)। রাজধানী দিল্লির এই শহরগুলির শত শত পরিবার, যারা রান্না, পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে তাঁদের ওপর নির্ভর করতেন, তাঁরা এখন বিপাকে পড়েছেন।
পরিযায়ী শ্রমিকদের হঠাৎ শহর ছেড়ে যাওয়ার পিছনে মূলত দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কড়া অভিযান, যার ফলে বহু বাংলাভাষী শ্রমিককে আটক করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (SIR) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় আতঙ্ক।
নয়ডার গৌর সিটির কয়েকটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন জানিয়েছেন, তাঁর বস্তিতে থাকা বহু বাংলাভাষী ইতিমধ্যেই ট্রেনের টিকিট কেটে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে গেছেন। তিনিও পরিবারের সঙ্গে ফিরছেন।
গুরগাঁও থেকে ফেরত আসা এক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তাঁকে বাংলাদেশি ভেবে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করেছে। কেউ আবার দাবি করেছেন, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য পুলিশ তাঁকে জামাকাপড় খুলে ফেলতে বাধ্য করেছে।
২০১৬ সালে সংসদে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছিলেন, ভারতে প্রায় দু'কোটি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। তাই অনুপ্রবেশ ও এদের বিস্তার এখন জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের বড় কারণ। কিন্তু বর্তমান অভিযান মানবিক সঙ্কটও তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এই ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে বড় করে তুলেছেন। তিনি রাজ্যে ফিরে আসা শ্রমিকদের সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “মুম্বই, উত্তরপ্রদেশ বা রাজস্থানে থাকার প্রয়োজন নেই। আমি হয়তো পিঠে বা পায়েস খাওয়াতে পারব না, কিন্তু যদি আমরা একটি রুটি খাই, আপনাদেরও একটি দেব। শান্তিতে পশ্চিমবঙ্গে থাকতে পারবেন।” তিনি আরও জানান, “পুলিশের হেল্পলাইন নম্বর আপনারা জানেন। ফেরার ইচ্ছা হলে জানাবেন, আমরা ট্রেনে ফিরিয়ে আনব।”
দিল্লিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের অধিকাংশই নয়ডা ও গুরগাঁওর কর্পোরেট ও আইটি শহরগুলোতে গৃহকর্মের কাজ করেন। রাস্তা পরিষ্কার, গাড়ি ধোয়া থেকে শুরু করে রান্না ও বাসন মাজা, সবই তারা করতেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক বাংলায় ফিরে এসেছেন। তবে বাস্তবে সেই সংখ্যাটা আরও বেশি।
নয়ডার গৌর সিটি, যেখানে ১৬টি হাউজিং সোসাইটি রয়েছে, তার পাশেই হাইবাতপুরের বিশাল বস্তি এলাকায় মূলত পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের শত শত অভিবাসী বাস করেন। এখন সেই বস্তির বহু ঘর তালাবন্ধ, বাসিন্দারা পালিয়েছেন। অনেকে বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত সামগ্রী, পোশাক, শিশুদের পড়াশোনা ফেলে গিয়েছেন।
কাজ ছেড়ে নিজেদের দাবিতে ফিরে আসার খুশি আছে। তবে সেইসঙ্গে রয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্ক! যে সমস্ত শ্রমিকরা রাজধানীতে মাসে ৩০, ৪০, ৫০ হাজার টাকা রোজগার করতেন, তাঁরা হয়তো এখন গ্রামের ক্ষেতে দিনমজুরের কাজ করে দিনে ২০০-২৫০ টাকা পাবেন।
গৃহকর্মী চলে যাওয়ায় ব্যস্ত কর্মজীবী পরিবারগুলো বিপাকে। কিছু হাউজিং সোসাইটি বাসিন্দাদের গৃহকর্মীদের চূড়ান্ত পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট জমা দিতে বলেছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। অভিযোগ উঠছে, 'কাগজপত্র দেখালেও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন আটকে রাখছে।'