ট্যাটু (tattoo), চেইন-আংটি (chain-ring)-র সামান্য চিহ্নগুলোই প্রিয়জনের শেষ অস্তিত্ব (victims in Delhi incident) চিনিয়ে দিয়েছে পরিবারকে, নিশ্চিত করেছে তাদের আশঙ্কা।

শেষ আপডেট: 12 November 2025 12:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁদের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করার মাধ্যম ওই ট্যাটু দেখেই অমরের (Amar Kataria, Delhi blast victim) বাবা চিনতে পেরেছেন ছেলেকে। রক্তাক্ত ওই হাতে তখনও জ্বলজ্বল করছে ‘Mom my first love’ ও ‘Dad my strength’। পুত্রশোক চেপে রেখে বাড়িতে বাবার অপেক্ষায় থাকা তিন বছরের ছোট্ট বাচ্চাটিকে কী উত্তর দেবেন দাদু-ঠাকুমা?
দিল্লির লালকেল্লার কাছে ভয়াবহ বিস্ফোরণের (Delhi Red Fort explosion) পর সোমবার সন্ধ্যায় মুহূর্তে ওই এলাকায় আতঙ্ক ছেয়ে যায়। নিহতদের পরিবার প্রায় পাগলের মতো ছুটছিল হাসপাতাল ও মর্গে। চারদিকে রক্তের দাগ, একটাই প্রশ্ন বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, 'ও এখন কোথায়?' (Delhi Blast victims)। তারপর হাসপাতাল ও মর্গে একের পর এক নিথর দেহের সারি, কাউকে আলাদা করে চেনার উপায় নেই। প্রিয়জনদের ভরসা তখন ছোট ছোট স্মৃতিতে - কারও হাতের ট্যাটু, কারও পরনে থাকা পরিচিত টি-শার্টেই খুঁজে নিতে হচ্ছিল জীবনের পরিচয়টুকু (tshirt tattoo identification in Delhi Blast)।
বেশিরভাগ দেহ এতটাই বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে চেনার উপায় ছিল না। এই পরিস্থিতিতেই পরিবারের সদস্যদের হাতে এসে পৌঁছয় মৃত্যুর নির্মম প্রমাণ - ছেঁড়া, পোড়া জামাকাপড়, কিংবা শরীরে খোদাই করা ট্যাটু। এই সামান্য চিহ্নগুলোই প্রিয়জনের শেষ অস্তিত্ব চিনিয়ে দিয়েছে পরিবারকে, নিশ্চিত করেছে তাদের আশঙ্কা। যে মানুষটিকে তাঁরা খবর পাওয়া ইস্তক হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন, সে আর ফিরবে না।
মৃতদের মধ্যে এখন পর্যন্ত পাওয়া খবর বলছে, ছ’জনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। বাকি দেহগুলি চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।
সোমবার লালকেল্লার কাছে সুভাষ মার্গের ট্র্যাফিক সিগন্যালের পাশে একটি হুন্ডাই আই২০ (Hyundai i20 blast in Delhi) গাড়িতে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুনে গাড়িটি ছারখার হয়ে যায়। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির জানলাও চুরমার হয়ে পড়ে, বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় কয়েকশো মিটার দূর পর্যন্ত। এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী অন্তত ১৩ জন মৃত্যু হয়েছে, বহু মানুষ আহত।
অমর কাটারিয়া: চেইন, ট্যাটুই হয়ে রইল তাঁর শেষ স্মৃতি
৩৪ বছরের অমর কাটারিয়া ছিলেন চাঁদনি চক এলাকার এক ওষুধ ব্যবসায়ী। সোমবার সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে তিনি ফিরছিলেন বাড়ি। বিস্ফোরণের পর তাঁর দেহ এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে চেনার উপায় ছিল না। কিন্তু তাঁর দুই হাতে খোদাই করা ট্যাটু - ‘Mom my first love’ ও ‘Dad my strength’ - শেষ পর্যন্ত চিনিয়ে দিল তাঁকে।
পরিবার জানায়, এই ট্যাটুগুলিই তাদের নিশ্চিত করেছে যে সেই দেহ অমরেরই। অমরের বাবা সংবাদমাধ্যমে জানান, “ওর দোকান ভগীরথ প্লেসে। সন্ধ্যা পৌনে ছ’টা নাগাদ বেরয়। ওর ফোন এক মহিলা ধরেছিলেন, বললেন বিস্ফোরণ হয়েছে। পরে মর্গে গিয়ে আমরা হাতে থাকা ট্যাটু, চেইন-আংটি আর কানের দুল দেখে ওকে চিনতে পারি।”
অমরের পরিবারে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ও তিন বছরের একটি সন্তান।
জুম্মান: এক টুকরো টি-শার্টই পরিচয়ের গল্প
আরেকজনকে হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন তাঁর পরিবার। প্রায় ২০ ঘণ্টা ধরে খোঁজ চলছিল নিখোঁজ জুম্মানের। শেষে মর্গে গিয়ে যখন এক দেহের উপর থেকে চাদর সরানো হল, পরিবারের লোকজন বুঝলেন, এই তাঁদের জুম্মান।
তাঁর কাকা মহম্মদ ইদরিস জানান, “ওর পা ছিল না, শরীরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু টি-শার্ট দেখে আমরা বুঝে যাই এটাই ও।”
জুম্মান থাকতেন শাস্ত্রী পার্কে। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য। রেখে গেলেন প্রতিবন্ধী স্ত্রী ও সন্তানদের।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে বেশ কয়েকজনের কানের পর্দা, ফুসফুস ও অন্ত্র পর্যন্ত ছিঁড়ে গিয়েছে। কেউ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান, কেউ বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মারা যান। মৃতদেহগুলিতে ক্রস-ইনজুরি প্যাটার্ন দেখা গিয়েছে, যা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরকের ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিস্ফোরণের তদন্তে একাধিক সংস্থা, আশ্বাস দিলেন প্রধানমন্ত্রী
দিল্লি পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিস্ফোরণটি ঘটে যখন একটি ধীর গতির Hyundai i20 গাড়ি লালকেল্লার কাছে সুভাষ মার্গ মোড়ে পৌঁছয়। গাড়িটি মুহূর্তেই বিস্ফোরণের কবলে পড়ে এবং আশপাশের বেশ কয়েকটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যে একাধিক সংস্থা নেমে পড়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, সব ধরনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের তরফে UAPA (Unlawful Activities Prevention Act), Explosives Act ও ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে কোটওয়ালি থানায়।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আশ্বাস দিয়েছেন, দোষীদের কোনওভাবেই রেহাই দেওয়া হবে না। এই ঘটনার সঙ্গে যারা যুক্ত, প্রত্যেককেই আইনের মুখোমুখি হতে হবে।