ফরেন্সিক বিষয়ে পড়াশোনা করা ওই তরুণী জানতেন, কীভাবে অপরাধস্থল বদলে দিতে হয়, কীভাবে আঙুলের ছাপ মুছে ফেলা যায়, আর কীভাবে আগুন লাগার পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 29 October 2025 11:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'পারফেক্ট ক্রাইম' (Perfect Crime) করেও শেষ পর্যন্ত নিজেকে বাঁচাতে পারেননি তিনি। ধরা পড়ে গেছেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে। দিল্লির (New Delhi) ওই তরুণী ভেবেছিলেন, অপরাধ জগতের কৌশলগুলি তিনি বই ও ওয়েব সিরিজের মতোই নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছেন। ফরেন্সিক সায়েন্সের ছাত্রীর (Forensic Student) তাই মনে হয়েছিল — এমন এক হত্যাকাণ্ড ঘটাবেন যা দেখলে তদন্তকারীরাও বিশ্বাস করবেন, এটি নিছকই দুর্ঘটনা (Accident)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হয়ে গেল, সিনেমার মতো বাস্তবে 'পারফেক্ট ক্রাইম' বলে আদতে কিছু হয় না।
উত্তর দিল্লির তিমারপুরে লিভ-ইন পার্টনারকে (Live-in Partner) খুন করেন অমৃতা চৌহান (Amrita Chauhan)। তাঁকে সাহায্য করে তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক ও এক বন্ধু। প্রথমে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা, তারপর ঘি, তেল ও অ্যালকোহলের মিশ্রণ ঢেলে দেহে আগুন ধরানো হয়। উদ্দেশ্য - গোটা ঘটনাটিকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ (Cylinder Blast) বলে মনে করানো।
ফরেন্সিক বিষয়ে পড়াশোনা করা ওই তরুণী জানতেন, কীভাবে অপরাধস্থল বদলে দিতে হয়, কীভাবে আঙুলের ছাপ মুছে ফেলা যায়, আর কীভাবে আগুন লাগার পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব। তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক, যিনি গ্যাস সিলিন্ডার বিতরণ সংস্থায় কাজ করেন, জানতেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণের দৃশ্য কীভাবে বাস্তবসম্মত করে তোলা যায়।
প্রথম ধারণা: নিছক দুর্ঘটনা
ঘটনার খবর পেয়ে তিমারপুরের গান্ধী বিহারে পৌঁছয় পুলিশ। প্রথমে তদন্তকারীদের কাছেও বিষয়টি দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়। কারণ ঘর পুড়ে ছারখার, দেহ চেনা যাচ্ছিল না। ঠিক সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হলে যেমন হয়। কিন্তু শিগগিরই কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়ে তদন্তকারীদের।
সিসিটিভি ও ফরেন্সিক প্রমাণ
মৃতদেহে আগুনের দাগের ধরণ গ্যাস বিস্ফোরণের সঙ্গে মেলে না। ঘরের নির্দিষ্ট কোণে আগুনের তীব্রতা অস্বাভাবিক, যা ইঙ্গিত দেয় - এখানে ঘি, তেল বা অ্যালকোহলের মতো দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানেই ফাটল ধরতে শুরু করে অমৃতার ‘নিখুঁত পরিকল্পনা’-য়।
ফরেন্সিক দল একদিকে ঘটনাস্থলে তদন্ত চালাতে থাকে, অন্যদিকে পুলিশ খতিয়ে দেখতে শুরু করে আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ। আর সেখানেই ধরা পড়ে আসল ছবি।
সিসিটিভিতে দেখা যায়, আগুন লাগার কিছুক্ষণ আগে, দুই মুখোশধারী পুরুষ একটি ফ্ল্যাটে ঢুকছে, কিছুক্ষণ পর তাঁদের সঙ্গে আসে এক মহিলা। তিনজন বেরিয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিট পরেই লাগে ভয়াবহ আগুন।
প্রযুক্তিগত নজরদারি ও ফোনের তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, ঘটনার সময় ওই তরুণী ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন - যা তাঁর দেওয়া যুক্তিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে। তদন্তে জানা যায়, খুনের পর তাঁরা দরজার জালের কাটা অংশ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে পালিয়ে যায়।
সূত্র ধরে গ্রেফতার
মোবাইল লোকেশন ও কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে গত ১৮ অক্টোবর মোরাদাবাদ থেকে ওই তরুণীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরের কয়েক দিনে ধরা পড়ে তাঁর প্রাক্তন প্রেমিক ও অপর এক সহযোগীও। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় মৃত ব্যক্তির হার্ডডিস্ক, ব্যাগ, জামা, ও একাধিক মোবাইল ফোন - যেগুলি অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
ইতিমধ্যে অমৃতা চৌহান সম্পর্কে জানা গেছে, আগেই তাঁকে ত্যাজ্য করেছিল পরিবার (Disowned by Family)! ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ৮ জুলাই, ২০২৪-এ অমৃতার বাবা-মা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে মেয়ের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই বিজ্ঞাপনের কপি ইতিমধ্যে আদালতে নথি হিসেবে জমা পড়েছে।
ওই তরুণী সম্প্রতি জানতে পারেন যে, লিভ-ইন পার্টনার গোপনে তাঁর একাধিক অশ্লীল ভিডিও (Obscene Video) রেকর্ড করে হার্ড ডিস্কে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সে ভিডিওগুলি মুছে ফেলতে রাজি হননি। অপমান ও ক্ষোভে তিনি তাঁর প্রাক্তন প্রেমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে খুনের পরিকল্পনা করেন।