প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও। ওই বেঞ্চই এই প্রবণতাকে 'দুর্ভাগ্যজনক' বলে উল্লেখ করে মন্তব্য করে, অবসরের প্রাক্কালে কিছু বিচারক যেন ‘ছক্কা হাঁকাতে’ চাইছেন।

শেষ আপডেট: 18 December 2025 17:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিচারব্যবস্থার অন্দরমহলে দুর্নীতির (judicial corruption remark) ইঙ্গিতপূর্ণ এক অস্বস্তিকর বাস্তব রয়েছে, সে কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (CJI Surya Kant)। বুধবার তিনি বলেন, অবসরের ঠিক আগের সময়ে কিছু বিচারকের আচরণে (judges orders before retirement) একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে তাঁরা বাইরের বিবেচনায় একের পর এক বিচারাদেশ দিচ্ছেন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও। ওই বেঞ্চই এই প্রবণতাকে 'দুর্ভাগ্যজনক' বলে উল্লেখ করে মন্তব্য করে, অবসরের প্রাক্কালে কিছু বিচারক যেন ‘ছক্কা হাঁকাতে’ চাইছেন।
অবসরের ১০ দিন আগে সাসপেনশন, সুপ্রিম কোর্টে মামলা
মধ্যপ্রদেশের এক প্রিন্সিপাল ডিস্ট্রিক্ট জজ অবসরের মাত্র ১০ দিন আগে সাসপেন্ড হওয়ায় সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন। বুধবার সেই মামলার শুনানিতেই এই মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।
অভিযোগ ছিল, ওই বিচারক অবসরের ঠিক আগে দু’টি বিচারাদেশ দিয়েছিলেন, যেগুলির সঙ্গে তাঁর সাসপেনশনের যোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
এই প্রসঙ্গে আদালতের পর্যবেক্ষণ, “আবেদনকারী অবসরের ঠিক আগে 'ছক্কা হাঁকানো' শুরু করেছিলেন। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক প্রবণতা। আমি এ নিয়ে আর বিস্তারিত বলতে চাই না।”
অবসর, বয়স বৃদ্ধি এবং এক বছরের ‘এক্সটেনশন’
ওই জেলা বিচারকের অবসর নেওয়ার কথা ছিল ৩০ নভেম্বর। কিন্তু ১৯ নভেম্বর তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়। এরপর ২০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ওই বিচারকের অবসরের সময় এক বছরের জন্য পিছিয়ে দিতে মধ্যপ্রদেশ সরকারকে নির্দেশ দেয়। কারণ এর মধ্যেই রাজ্য সরকার কর্মীদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে ৬২ বছর করেছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে খানিক রসিকতার সুরে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন,
“ওই বিচারক যখন এই দু’টি আদেশ দিয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেনই না যে তাঁর অবসরের বয়স এক বছর বেড়েছে। অবসরের আগে বিচারকরা অনেক বেশি আদেশ দিতে শুরু করছেন - এটা ক্রমশ বাড়ছে।”
হাইকোর্টে না গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কেন?
শুনানির সময় বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে, সাসপেনশনের বিরুদ্ধে কেন ওই জেলা বিচারক প্রথমে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হননি।
এর উত্তরে বিচারকের আইনজীবী জানান, যেহেতু এটি একটি ‘ফুল কোর্ট’ সিদ্ধান্ত ছিল, তাই ন্যায্য শুনানির আশায় সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আসাই শ্রেয় বলে মনে করেছিলেন ওই বিচারক।
‘ভাল রেকর্ড থাকা বিচারককে কীভাবে সাসপেন্ড করা যায়?’
বিচারকের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে সিনিয়র আইনজীবী বিপিন সাংঘী আদালতকে জানান, সংশ্লিষ্ট বিচারকের কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। তাঁর বার্ষিক গোপন মূল্যায়ন রিপোর্টে (ACR) বরাবরই ভাল নম্বর পেয়েছেন তিনি।
সাংঘীর প্রশ্ন, “যে বিচারাদেশগুলির বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করা যায় এবং সংশোধন সম্ভব, সেই ধরনের বিচারাদেশের জন্য কীভাবে কোনও বিচারককে সাসপেন্ড করা যায়?”
এর জবাবে বেঞ্চ স্পষ্ট করে জানায়, “ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ বিচারাদেশ দেওয়ার জন্য কোনও বিচারকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। সেই কারণে তাঁকে সাসপেন্ডও করা যায় না। কিন্তু যদি সেই আদেশগুলি প্রকাশ্যভাবে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রসূত হয়, তাহলে বিষয়টি আলাদা।”
মামলা খারিজ, হাই কোর্টে যাওয়ার নির্দেশ
আদালত আরও জানায়, অতীতেও বহু ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ফুল কোর্টের সিদ্ধান্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাতিল হয়েছে। সেই কারণেই সুপ্রিম কোর্ট এই মামলায় হস্তক্ষেপ করতে চায়নি এবং আবেদনকারীকে হাইকোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
RTI নিয়ে অসন্তোষ আদালতের
এছাড়াও আদালত আপত্তি তোলে, ওই বিচারক নিজের সাসপেনশনের কারণ জানতে আরটিআই (RTI) আবেদন করেছিলেন।
বেঞ্চের মন্তব্য, “এই বিষয়ে তিনি প্রতিনিধিত্ব জমা দিতে পারতেন। একজন সিনিয়র বিচারকের কাছ থেকে এই ধরনের তথ্য পেতে আরটিআইয়ের পথে যাওয়ার প্রত্যাশা করা যায় না।”