১৯৬২-র ১০ ফেব্রুয়ারি, হরিয়ানার হিসারের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। নিজের গ্রাম পেটওয়ারের সেই কুঁড়েঘর আজও তাঁর হৃদয়ের ঠিকানা।

দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত
শেষ আপডেট: 24 November 2025 14:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশের সর্বোচ্চ বিচারপদে উঠে এলেন হরিয়ানার সন্তান, সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) নতুন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (CJI Surya Kanta)। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রথমবার, ১৯৫০ সালে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) আত্মপ্রকাশের পর থেকে হরিয়ানার (Haryana) কোনও মানুষ এই পদ অলঙ্কৃত করলেন। চার দশকের দীর্ঘ আইনজীবী-যাত্রা আর বিচারের কর্মধারাকে স্মরণ করে তাঁর জন্মভিটে পেটওয়ার গ্রামে গিয়ে বললেন, ‘‘আমার সব স্মৃতি এই ঘর আর এই মাটির সঙ্গে জড়িয়ে।’’
গ্রামের সরু রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই স্কুল— খাটিয়ায় বসে স্মৃতিচারণ
১৯৬২-র ১০ ফেব্রুয়ারি, হরিয়ানার হিসারের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। নিজের গ্রাম পেটওয়ারের সেই কুঁড়েঘর আজও তাঁর হৃদয়ের ঠিকানা। খাটিয়ায় হেলান দিয়ে শৈশবের কথা মনে পড়তেই একটি সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানালেন ‘‘আমরা ব্যাগ হাতে এই গলি ধরে স্কুলে যেতাম। এখানেই খেলাধুলো, এখানেই প্রথম পাঠ।’’
মাত্র ৬ ফুট × ৮ ফুটের ছোট্ট পড়ার ঘরটি দেখতে দেখতে বলে চললেন, ‘‘আমরা চারজন একসঙ্গে রাতভর পড়তাম। আমাদের ইংরেজির স্যার প্রেম সিংহ তো পরীক্ষার আগে স্কুলে নিয়ে গিয়ে রাত ১১টা–১২টা পর্যন্ত পড়াতেন। বিদ্যুৎ ছিল ঠিকই, কিন্তু লো-ভোল্টেজের দৌলতে বাতি জ্বলত না। তাই কাদা মাখা তেলের প্রদীপেই পড়াশোনা চলত।
‘বিচারব্যবস্থা কী— সেই ধারণাই ছিল না’
ছেলেবেলায় বিচারপতি তো দূর, ‘জুডিশিয়ারি’ শব্দটাই শুনেছেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে প্রধান বিচারপতির। জানালেন, ‘‘গ্রামে তখন লক্ষ্য একটাই, ম্যাট্রিক পাশ করো, চাকরি করো। কলেজে গেলে তো আরও চাকরি-চাপ।’’
কিন্তু সূর্যকান্তের ইচ্ছে আলাদা। ভাইরা চেয়েছিলেন ভূগোল নিয়ে এমএ করুক। কিন্তু তাঁর জেদ, তিনি আইন পড়বেন। বাবা-মা পাশে দাঁড়ালেন। ১৯৮৪ সালে রোহতকের মহর্ষি দয়ানন্দ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন স্নাতক হলেন তিনি।
জেলা আদালত থেকে হাইকোর্ট— ‘এই ছেলেটাকে নষ্ট কোরো না’
হিসারের জেলা আদালতেই আইন জীবন শুরু। চার-পাঁচ মাসের মধ্যেই সিনিয়রের এক মামলায় হাজির হয়ে যুক্তি সাজালেন এমন সাবলীলতায় যে বিচারক চমকে উঠেছিলেন। আদালতের সব সিনিয়র আইনজীবীকে ডেকে বলেছিলেন— ‘‘ছেলেটাকে এখানে নষ্ট করো না। ওকে হাইকোর্টে পাঠাও।’’
পরের দিনই সিনিয়র তাঁকে নিয়ে চলে যান চণ্ডীগড়ে। সেখান থেকেই উত্থান শুরু। দ্রুতই রাজ্যের অন্যতম সফল আইনজীবীর পরিচিতি। ২০০০ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে হরিয়ানার কনিষ্ঠ অ্যাডভোকেট জেনারেল।
হিমাচল থেকে সুপ্রিম কোর্ট— মনে রাখার মতো রায়গুলির কারিগর
২০১৮ সালে হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। পরের বছর সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসেবে উন্নীত। বহু ঐতিহাসিক রায়ের পেছনে তাঁর বিচার-বিবেচনা। যেমন—
রাজ্যপাল–রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে সাম্প্রতিক প্রেসিডেন রেফারেন্স
উপনিবেশিক যুগের দেশদ্রোহ আইন স্থগিত— নতুন মামলা নয়
বিহারে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ৬৫ লক্ষ নাম প্রকাশে কমিশনকে নির্দেশ
বেআইনিভাবে অপসারিত মহিলা প্রধানকে পুনর্বহাল— লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে তিরস্কার
বার অ্যাসোসিয়েশনগুলিতে এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ
‘আমি ভাবিনি কখনও দেশের প্রধান বিচারপতি হব’
গ্রামের মাঠে ফসল কাটার পর সেই কিশোর কি কখনও কল্পনায় দেখেছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি হওয়া? তাঁর উত্তর, ‘‘না, কখনওই না। বিচারব্যবস্থা কী, তা-ই জানতাম না।’’ তবু অভিভাবক, শিক্ষক, গ্রামের প্রবীণদের আশীর্বাদে একের পর এক পথ পেরিয়েছেন তিনি। আজ সেই সূর্য কান্ত দেশের ৫৩তম প্রধান বিচারপতি।