আংমো হলেন প্রথম ভারতীয় দৃষ্টিহীন কন্যা যিনি এভারেস্ট ছুঁলেন এবং পৃথিবীতে পঞ্চম।

ছোংজিন আংমো।
শেষ আপডেট: 23 May 2025 11:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হিমাচল প্রদেশের কিন্নৌর জেলার হাংরাং উপত্যকার এক প্রত্যন্ত গ্রামে প্রতিদিনের মতো সকালে কাজ শুরু করেছিলেন অমর চাঁদ। কাজ বলতে তাঁর এক একরের মতো জমিতে রোজ সকালের মতোই কড়াইশুঁটি ও আপেল বাগানের দেখভাল করছিলেন। সেই সময় মোবাইলে আসা একটি ভিডিও ক্লিপ দেখে তাঁর সারা জীবনের সোমবার যেন সার্থক হয়ে উঠল।
অমর চাঁদের মেয়ে ছোংজিন আংমো, বয়স ২৯, মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকা ওড়াচ্ছে। এও সত্যি! এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভাবার সময় নিয়েছিলেন বাবা। কারণ তাঁর মেয়ে যে চোখে দেখতে পায় না। দৃষ্টিহীন। আংমোকে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর দুই শেরপা দান্ডু ও ওম গুরুং আর সঙ্গে রয়েছেন প্রাক্তন সেনাকর্মী লেফটেন্যান্ট কর্নেল বার্ঠওয়াল, যিনি এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আংমোর এই এভারেস্ট জয়ের আনন্দের সঙ্গে অন্য পাঁচজনের শিখরজয়ের কোনও সম্পর্ক নেই। কারণ তিনি হলেন প্রথম ভারতীয় দৃষ্টিহীন কন্যা যিনি এভারেস্ট ছুঁলেন এবং পৃথিবীতে পঞ্চম। তাঁর আগে প্রথম দৃষ্টিহীন এভারেস্টে উঠেছিলেন আমেরিকার এরিক ওয়েহেনমায়ার (২০০১), দ্বিতীয় জন ছিলেন অস্ট্রীয় অ্যান্ডি হোলজার (২০১৭), চিনের ঝ্যাং হং (২০২১) ও আমেরিকার লোনি বেডওয়েল (২০২৩)। কিন্তু তাঁরা সবাই পুরুষ। আংমো প্রথম মহিলা দৃষ্টিহীন হিসেবে এভারেস্ট চূড়ায় পা রাখার রেকর্ড ঘরে তুললেন।
ফিরে এসে আংমো জানান, ওঠার সময় প্রতিটি পদক্ষেপে আমার মনে হয়েছিল আমি সক্ষম না বিশেষভাবে সক্ষম। এটাই একমাত্র পদক্ষেপ যা সমস্ত বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের মধ্যে ইচ্ছাশক্তি জাগিয়ে তুলবে। আমাদের ভিতরে যদি ইচ্ছাশক্তি থাকে তাহলে আমরা সব পারি। কোনও কিছুই আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।
তিনি জানান, তাঁর জীবনের আদর্শ হেলেন কেলার। তাঁর বই-জীবনী আমি স্কুলে পড়ার সময় থেকে পড়ছি। আমার বাবাও আমার জীবনের আদর্শ। একটা সময় ছিল যখন অন্যরা আমায় দৃষ্টিহীন টিটকারি দিত। কিন্তু, বাবা ও পরিবারের অন্যরা আমায় উৎসাহ দিত। সে সময় ভেঙে পড়লে আজকের দিন দেখতাম না।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ছোটর উপরের বোন আংমো তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় একটি মেডিসিন অ্যালার্জিতে দৃষ্টিশক্তি হারায়। স্কুলের শিক্ষকরা তাঁদের বাড়ির লোককে জানান, সে বোর্ড দেখে লেখার সময় খুব কষ্ট করে। তারপর দিনই তাকে নিয়ে ২১০ কিমি দূরের স্থানীয় হাসপাতাল সেখান থেকে শিমলার হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু কোনও ফল হয়নি। যত দিন গিয়েছে ততই আংমো দুচোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হতে হতে একেবার অন্ধকার হয়ে যায় এই পৃথিবী।
পরে তাকে ভর্তি করা লেহ্-র মহাবোধী স্কুলে। দৃষ্টিহীন বাচ্চাদের এই স্কুল শেষ করে আংমো দিল্লির মিরান্ডা হাউস থেকে স্নাতক পাশ করেন। স্নাতক হওয়ার পর তিনি ভর্তি হন পর্বতারোহী প্রশিক্ষণ স্কুলে। এরপর অসংখ্য ছোট-বড় অভিযানের পর অবশেষে এভারেস্ট ছোঁয়ার বাসনা মনে জাগে আংমোর। আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে সেই বাসনা পূরণও করে ফেললেন এই তরুণী। চোখে দেখতে না পেলেও পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে সূর্যের সবথেকে কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন এই কিন্নরী।