সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও ভেঙে পড়েছে—১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করা হয়েছে এবং প্রায় ১৪০ জনকে মিথ্যা সহিংস মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অশান্ত বাংলাদেশ।
শেষ আপডেট: 23 May 2025 08:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আওয়ামী লিগের কাযকর্ম নিষিদ্ধ (Ban on Awami League activities) ঘোষণা করে ১০ মে মহম্মদ ইউনুস (Md Yunus government) সরকারের বিজ্ঞপ্তিকে বেআইনি, গণতন্ত্র (democracy) ও মানবাধিকার (human rights) বিরোধী বলে বর্ণনা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) । ইউরোপের একাধিক নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠন অবিলম্বে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ হস্তক্ষেপ করতে ইউরোপিয় ইউনিয়নকে (European Union) স্মারকলিপি দিয়েছে।
আমেরিকা ভিত্তিক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং গুরুতর নিপীড়নের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পূরণ না করেই ইউনুস সরকার ক্ষমতাচ্যুত নেতা শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লিগের সমর্থকদের অধিকার দমনে উদ্যোগী হয়েছে। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে শেখ হাসিনার দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে ওই আন্তর্জাতিক সংস্থা।
প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রসংঘের সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ হাসিনার সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পক্ষে রিপোর্ট দিলেও তারাও দলতে নিষিদ্ধ ঘোষণা বা স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে না দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ না করতে ইউনুস সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তা মানেনি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ করতে আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিল। এখন তাঁর দল আওয়ামী লিগের সমর্থকদের ওপর একই ধরনের দমনপীড়ন করা মৌলিক স্বাধীনতা লঙ্ঘন।
এদিকে, ইউরোপীয় নাগরিক সমাজের বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা, জেল হেফাজতে নির্যাতন, সংবাদমাধ্যমের সেন্সরশিপ এবং ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাতে হামলা নির্বিচারে ঘটে চলেছে। ইসলামপন্থীরা প্রাক্তন সরকারের সমর্থক বলে সন্দেহভাজন সংখ্যালঘু এবং অঞ্চলভিত্তিক জনগণকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে, নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে।
সম্প্রতি ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য, সাউথ এশিয়া ডেমোক্র্যাটিক ফোরাম, বেলজিয়াম, ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি ও আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক, তুরস্ক-এর পক্ষ থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক কমিশনার কাজা ক্যালাস ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রতিনিধিকে এই বিষয়ে ১৬ পৃষ্টার একটি চিঠি দিয়েছেন।
‘বাংলাদেশে চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক বিশদ প্রতিবেদনে তারা বলেছে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিক এবং ইউরোপীয় সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ ছাড়া স্বেচ্ছাচারী কার্যক্রম বন্ধ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তারা লিখেছে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের বিশ্বজনীন রক্ষক হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ সংকট মোকাবেলায় ভূমিকা পালন করা উচিত। আমরা ইইউ-কে এই বিষয়ে জরুরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাচ্ছি। তারা তাদের আবেদনে রাজনৈতিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, জেল হেফাজতে হত্যা এবং রাজনৈতিক নেতাদের সম্পত্তি ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নিন্দা জানান।
একইসঙ্গে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও ভেঙে পড়েছে—১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করা হয়েছে এবং প্রায় ১৪০ জনকে মিথ্যা সহিংস মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রভাবশালী গণমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার প্রতিদিনই হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তায় সুযোগে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীরা এই কাজে উৎসাহিত হচ্ছে। লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীরকে বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়েছে এবং তাকে যথাযথ চিকিৎসা সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে না।
এই সব বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত দাবি করে, হেফাজতে মৃত্যুর এবং বিরোধী নেতাদের ওপর হামলার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান। দোষীদের ন্যায্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা হোক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়তা, বাংলাদেশের সরকারকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বন্ধ করতে এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে আহ্বান জানান।
এছাড়া প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করুন এই মর্মে সাংবাদিকদের হয়রানি, হামলা ও গ্রেপ্তার থেকে রক্ষা, বাতিল করা অ্যাক্রেডিটেশন পুনর্বহাল এবং সংবাদমাধ্যমের নির্ভীক কার্যক্রম নিশ্চিত করার বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের কথাও উল্লেখ করেছেন।
এই প্রতিনিধিরা ক্রমবর্ধমান বিচার বহির্ভূত হত্যা ও মব ভায়োলেন্স নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা চিঠিতে উল্লেখ করেন, সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে অন্ততঃ ২১ জন নিহত হয় এবং একই সাথে মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে নিহত হন ১২৩ জন।
তারা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ এখন এক সংকটজনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত সম্ভব নয়।। আমরা বিশ্বাস করি ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়াবে। সহিংসতা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতিমালার প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছানো উচিত বলে তারা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবাধিকার সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ সংকট রুখতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশীয় নাগরিক সমাজের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তারা উল্লেখ করেছেন।
ইউরোপীয় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এই বিবৃতিটি দিয়েছেন, ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন, যোগাযোগ পরিচালক, ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম, যুক্তরাজ্য, পাওলো কাসাকা, নির্বাহী পরিচালক, সাউথ এশিয়া ডেমোক্র্যাটিক ফোরাম, ব্রাসেলস, ক্লাউস স্টেপেল, ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি ও তারিক গুনেরসেল, কবি, নাট্যকার ও প্রতিষ্ঠাতা সমন্বয়ক, আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক, তুরস্ক।