তিনি জানান, অ্যাপ ব্যবহারের সাফল্য নির্ভর করে জনসাধারণের অংশগ্রহণের ওপর। তাই প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে সরকার নির্দেশ পরিবর্তনের পথেও ভাবছে।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 3 December 2025 14:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের মধ্যে 'সঞ্চার সাথী' (Sanchar Saathi App) অ্যাপ নিয়ে বুধবার লোকসভায় (Loksabha) বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া (Jyotiraditya Scindia)। সরকারের নির্দেশে স্মার্টফোনে আগাম ইনস্টল থাকা এই সাইবারসুরক্ষা (Cyber Security) অ্যাপ নাগরিকদের ওপর ‘নজরদারি’ চালাতে পারে - বিরোধীদের এই অভিযোগকে তিনি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন।
সিন্ধিয়ার কথায়, “সঞ্চার সাথী দিয়ে কারও ওপর নজরদারির সুযোগ নেই। চাইলে অন্য যে কোনও অ্যাপের মতো এটিও মুছে ফেলা যাবে। ইচ্ছা না থাকলে কেউ এটি সক্রিয়ও করবেন না - এটাই গণতন্ত্রের অধিকার (Democratic Right)।” তিনি জানান, অ্যাপ ব্যবহারের সাফল্য নির্ভর করে জনসাধারণের অংশগ্রহণের ওপর। তাই প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে সরকার নির্দেশ পরিবর্তনের পথেও ভাবছে।
সোমবারের নির্দেশ নিয়ে ওঠা আপত্তির পর মন্ত্রী তাঁর এক্স পোস্টেও লিখেছিলেন - অ্যাপটি সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় রাখা সম্পূর্ণ ব্যবহারকারীর ইচ্ছা। এমনকী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি গুগল ম্যাপ-এর (Google Map) উদাহরণ টেনেও বলেছিলেন, “ফোনে অনেক অ্যাপ থাকে। আপনি চাইলে ব্যবহার করবেন, না চাইলে রাখবেন না।”
তবে বিরোধীদের অভিযোগ, আগাম ইনস্টল থাকা অ্যাপ মুছেও তার ফিচার পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয় কি না, সাধারণ ব্যবহারকারীর জানার উপায় নেই। ফলে গোপনে সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এর আগে পেগাসাস বিতর্কের ইস্যু টেনে বিরোধীরা সঞ্চার সাথীকে নতুন ‘নজরদারি টুল’ আখ্যা দিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী (Priyanka Gandhi) বলেন, “অবস্থাটা হাস্যকর। নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের চেষ্টা চলছে। দেশকে একনায়কত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।” কংগ্রেস সাংসদ কার্তি চিদম্বরমের অভিযোগ আরও তীব্র ছিল। বলেছিলেন, “রাশিয়া, উত্তর কোরিয়ার মতো নজরদারি ব্যবস্থা এ দেশে আনা হচ্ছে। আমাদের ব্যক্তিগত ছবি-তথ্যে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”
কী এই সঞ্চার সাথী অ্যাপ
কেন্দ্র জানিয়েছে, নাগরিকদের চুরি যাওয়া ফোন কিনে ফেলার ঝুঁকি কমাতে সঞ্চার সাথীকে (Sanchar Saathi) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আসলে অ্যাপটি ফোনে ইনস্টল (App Install) হলে এটি ক্যামেরা অ্যাক্সেস, কল ও মেসেজ মনিটরিং, নেটওয়ার্ক স্টেট পড়া, লোকেশন অ্যাক্সেস - অত্যন্ত সংবেদনশীল অনুমতি চাইবে। ‘ফোন ফাইন্ডার’ হিসেবে কাজ করতে এগুলো প্রয়োজন হতে পারে, তবে একইসঙ্গে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার জন্যও বড় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
অ্যাপ নিয়ে উদ্বেগের প্রধান ৫টি কারণ -
১. ‘নজরদারি অ্যাপ’ হয়ে ওঠার ভয় বাড়ছে
সরকার বলছে সঞ্চার সাথী মূলত চুরি যাওয়া বা ভুয়ো ফোন শনাক্ত করার কাজে লাগবে। কিন্তু ব্যবহারকারী কোনওভাবেই এটি মুছতে পারবেন না—এই বিধানই উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার কোনও অ্যাপকে অপারেটিং সিস্টেমের গভীরে ঢুকতে দিলে সেটি ভবিষ্যতে যে সর্বক্ষণিক লোকেশন ট্র্যাকার বা আরও বিস্তৃত নজরদারি টুলে পরিণত হবে না—তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রশ্ন উঠছে—আজ IMEI ট্র্যাকিং, কাল কি ডিজিটাল আইডি বা VPN নিষিদ্ধের মতো নতুন ক্ষমতা যুক্ত হবে?
২. ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা
মোবাইল ফোন আইনত ব্যক্তিগত সম্পত্তি - যেখানে থাকে বার্তা, নথি, ছবি, কাজের তথ্যসহ অজস্র সংবেদনশীল ডেটা। সমালোচকদের যুক্তি, একবার কোনও অ্যাপকে এমন সার্বক্ষণিক অধিকার দিলে এনক্রিপ্ট না-করা ডেটা বা ফোনের অভ্যন্তরীণ তথ্য সরকারের নজরে পড়বে না—এই নিশ্চয়তা কোথায়? ভবিষ্যতের কোনও আপডেটে অ্যাপের ক্ষমতা বাড়ানো হবে না—সেটাই বা কে বলবে? এই কারণেই অনেকেই বলছেন, এটি সরাসরি ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
৩. ডেটা সুরক্ষা আইনে সরকারের দায়বদ্ধতার ঘাটতি
নতুন ডেটা প্রোটেকশন আইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে কঠোর নিয়মের মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে বহু ছাড় রয়েছে। ফলে ডেটা অপব্যবহার হলে নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার রাস্তা সীমিত। বাধ্যতামূলক সরকারি অ্যাপের নির্দেশ সেই ফাঁকটিকেই আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এটাই বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ।
৪. ‘ব্লোটওয়্যার’ এবার সরকারি অনুমোদনে
স্মার্টফোনে বাণিজ্যিক বা অপ্রয়োজনীয় কিছু অ্যাপ আগে থেকেই প্রি-ইনস্টল থাকা নতুন কিছু নয়। তবে এবার সরকার নিজেই এমন একটি অ্যাপ চাপিয়ে দিচ্ছে—যা মুছতেও দেওয়া হবে না। প্রযুক্তিবিদদের একাংশের বক্তব্য, এতে ফোনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাত থেকে আরও সরে যাবে।
৫. কোনও জনমত, কোনও খসড়া - কিছুই প্রকাশ না করেই সিদ্ধান্ত
টেলিকম দফতরের নীতি–প্রণয়নের স্বচ্ছতা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল। সঞ্চার সাথীকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তেও জনপরামর্শ নেওয়া হয়নি, প্রকাশ করা হয়নি কোনও খসড়াও। হঠাৎই সরাসরি নির্দেশ জারি হয়েছে। বিরোধী মহল ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ - এটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একতরফা চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত।