কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত পরিসরে উঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। দাবি করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত তথ্য হাতাতেই এই অ্যাপের ব্যবহার। সঞ্চার সাথী - এই অ্যাপ নিয়েও সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 2 December 2025 12:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মোদী সরকারের (Modi Govt) একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, সঞ্চার সাথী (Sanchar Sathi) নামক অ্যাপ সব স্মার্টফোনে বাধ্যতামূলকভাবে প্রি-ইনস্টলড থাকতে হবে। এটি ফোন থেকে ডিলিট বা ডিসেবল করা যাবে না! কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তই ভাবাচ্ছে সকলকে।
স্বাভাবিকভাবেই সঞ্চার সাথী অ্যাপ ফিরিয়ে এনেছে পেগাসাস (Pegasus) বিতর্কের স্মৃতি। সে সময়ে জাতীয় রাজনীতি কার্যত উত্তাল হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত পরিসরে উঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। দাবি করা হচ্ছে, ব্যক্তিগত তথ্য হাতাতেই এই অ্যাপের ব্যবহার। সঞ্চার সাথী - এই অ্যাপ নিয়েও সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কেন্দ্র অবশ্য জানিয়েছে, নাগরিকদের চুরি যাওয়া ফোন কিনে ফেলার ঝুঁকি কমাতে সঞ্চার সাথীকে (Sanchar Sathi) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু অ্যাপটি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে তাও স্পষ্ট। আসলে অ্যাপটি ফোনে ইনস্টল (App Install) হলে এটি ক্যামেরা অ্যাক্সেস, কল ও মেসেজ মনিটরিং, নেটওয়ার্ক স্টেট পড়া, লোকেশন অ্যাক্সেস - অত্যন্ত সংবেদনশীল অনুমতি চাইবে। ‘ফোন ফাইন্ডার’ হিসেবে কাজ করতে এগুলো প্রয়োজন হতে পারে, তবে একইসঙ্গে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তার জন্যও বড় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
দেখে নেওয়া যাক অ্যাপ নিয়ে উদ্বেগের প্রধান ৫টি কারণ -
১. ‘নজরদারি অ্যাপ’ হয়ে ওঠার ভয় বাড়ছে
সরকার বলছে সঞ্চার সাথী মূলত চুরি যাওয়া বা ভুয়ো ফোন শনাক্ত করার কাজে লাগবে। কিন্তু ব্যবহারকারী কোনওভাবেই এটি মুছতে পারবেন না—এই বিধানই উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার কোনও অ্যাপকে অপারেটিং সিস্টেমের গভীরে ঢুকতে দিলে সেটি ভবিষ্যতে যে সর্বক্ষণিক লোকেশন ট্র্যাকার বা আরও বিস্তৃত নজরদারি টুলে পরিণত হবে না—তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই প্রশ্ন উঠছে—আজ IMEI ট্র্যাকিং, কাল কি ডিজিটাল আইডি বা VPN নিষিদ্ধের মতো নতুন ক্ষমতা যুক্ত হবে?
২. ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা
মোবাইল ফোন আইনত ব্যক্তিগত সম্পত্তি - যেখানে থাকে বার্তা, নথি, ছবি, কাজের তথ্যসহ অজস্র সংবেদনশীল ডেটা। সমালোচকদের যুক্তি, একবার কোনও অ্যাপকে এমন সার্বক্ষণিক অধিকার দিলে এনক্রিপ্ট না-করা ডেটা বা ফোনের অভ্যন্তরীণ তথ্য সরকারের নজরে পড়বে না—এই নিশ্চয়তা কোথায়? ভবিষ্যতের কোনও আপডেটে অ্যাপের ক্ষমতা বাড়ানো হবে না—সেটাই বা কে বলবে? এই কারণেই অনেকেই বলছেন, এটি সরাসরি ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
৩. ডেটা সুরক্ষা আইনে সরকারের দায়বদ্ধতার ঘাটতি
নতুন ডেটা প্রোটেকশন আইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকে কঠোর নিয়মের মুখোমুখি হতে হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে বহু ছাড় রয়েছে। ফলে ডেটা অপব্যবহার হলে নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার রাস্তা সীমিত। বাধ্যতামূলক সরকারি অ্যাপের নির্দেশ সেই ফাঁকটিকেই আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছে—এটাই বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ।
৪. ‘ব্লোটওয়্যার’ এবার সরকারি অনুমোদনে
স্মার্টফোনে বাণিজ্যিক বা অপ্রয়োজনীয় কিছু অ্যাপ আগে থেকেই প্রি-ইনস্টল থাকা নতুন কিছু নয়। তবে এবার সরকার নিজেই এমন একটি অ্যাপ চাপিয়ে দিচ্ছে—যা মুছতেও দেওয়া হবে না। প্রযুক্তিবিদদের একাংশের বক্তব্য, এতে ফোনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারকারীর হাত থেকে আরও সরে যাবে।
৫. কোনও জনমত, কোনও খসড়া - কিছুই প্রকাশ না করেই সিদ্ধান্ত
টেলিকম দফতরের নীতি–প্রণয়নের স্বচ্ছতা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল। সঞ্চার সাথীকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তেও জনপরামর্শ নেওয়া হয়নি, প্রকাশ করা হয়নি কোনও খসড়াও। হঠাৎই সরাসরি নির্দেশ জারি হয়েছে। বিরোধী মহল ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ—এটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একতরফা চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত।
গত ২৮ নভেম্বর সরকারের জারি করা নির্দেশে (India government order) স্যামসাং, অ্যাপল, শাওমি, ভিভো, অপো-সহ সব বড় মোবাইল প্রস্তুতকারক সংস্থাকে ৯০ দিনের মধ্যে এই নিয়ম মানতে বলা হয়েছে (Mandatory preloaded apps)। শুধু নতুন ফোন নয়, যেগুলো ইতিমধ্যেই বাজারে এসেছে বা সাপ্লাই চেইনে রয়েছে, সেগুলোকেও সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে অ্যাপটি দেওয়া হবে। যদিও নির্দেশটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি, নির্বাচিত কোম্পানিগুলিকে আলাদাভাবে জানানো হয়েছে।